মহেশপুরের যাদবপুরে গ্রাম আদালত নিয়ে জনসচেতনতা ক্যাম্পেইন: সহজে ও কম খরচে ন্যায়বিচারের বার্তা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার যাদবপুর ইউনিয়নে সাধারণ মানুষকে আইনি সেবা সম্পর্কে জানাতে এক ব্যতিক্রমী আয়োজন সম্পন্ন করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ যাতে নিজেদের ছোটখাটো বিরোধ মেটাতে গিয়ে অযথাই হয়রানির শিকার না হন, সেই উদ্দেশ্যে গ্রাম আদালত নিয়ে এক বিশাল জনসচেতনতা ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ এই বার্ষিক ক্যাম্পেইনের আয়োজন করে। গ্রামের মানুষ যাতে নিজেদের আইনি অধিকার সম্পর্কে জানতে পারেন এবং খুব সহজে নিজেদের দোরগোড়ায় বসে ন্যায়বিচার পান, সেটাই ছিল এই চমৎকার আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

ক্যাম্পেইনের শুরুতে ইউনিয়ন পরিষদ চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি বের করেন আয়োজকরা। র‍্যালিটি এলাকার প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার একই জায়গায় ফিরে আসে। র‍্যালিতে অংশগ্রহণকারী নানা বয়সের মানুষ হাতে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে হাঁটেন। তারা রাস্তার দুই ধারের উৎসুক মানুষের মাঝে গ্রাম আদালতের সুবিধা লেখা লিফলেট বিলি করেন। গ্রামের সাধারণ মানুষ একটু জমিজমার ঝামেলা বা পারিবারিক কলহের জেরে অনেক সময় জেলা শহরের জজ আদালতে দৌড়ান। সেখানে উকিল ধরা, যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ তাদের অনেক সময় ১০০থেকে৩০০(ডলার) বা ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে যায়। বছরের পর বছর এই টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক গরিব কৃষক নিঃস্ব হয়ে পড়েন। অথচ গ্রাম আদালতে মাত্র ১০ টাকা থেকে ২০ টাকা ফি দিয়ে এই ধরনের ছোটখাটো সমস্যার সমাধান করা একদম সম্ভব।

র‍্যালি শেষ হওয়ার পর ইউনিয়ন পরিষদ মিলনায়তনে একটি শিক্ষামূলক ভিডিও শোয়ের আয়োজন করেন আয়োজকরা। ভিডিওর মাধ্যমে গ্রামের সাধারণ মানুষকে দেখানো হয় তারা ঠিক কীভাবে একটি মামলা গ্রাম আদালতে দায়ের করবেন। ছোটখাটো চুরি, গবাদিপশুর ক্ষতি, মারামারি বা পাওনা টাকা আদায়ের মতো বিষয়গুলো কীভাবে গ্রামের মাতব্বর ও জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে দ্রুত নিষ্পত্তি করেন, তা ভিডিওতে খুব সুন্দর ও সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া হয়। উপস্থিত দর্শকরা খুব মনোযোগ দিয়ে ভিডিওটি দেখেন। তারা বুঝতে পারেন যে, জেলা আদালতে গিয়ে বছরের পর বছর ঘোরার চেয়ে নিজেদের ইউনিয়নে বসে মাত্র ১৫ দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে সমাধান পাওয়া অনেক বেশি লাভজনক ও শান্তির।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, গ্রামের প্রায় ৮০% ছোটখাটো মামলা বা বিরোধ এই গ্রাম আদালতের মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব। এতে করে যেমন মানুষের মূল্যবান সময় বাঁচে, তেমনি দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্কও ভালো থাকে। কারণ, কোর্ট-কাচারিতে গেলে দুই পরিবারের মধ্যে শত্রুতা চিরস্থায়ী রূপ নেয়। কিন্তু গ্রাম আদালত দুই পক্ষকে সামনাসামনি বসিয়ে একটি সম্মানজনক আপস-মীমাংসার পথ তৈরি করে দেয়। ফলে সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় থাকে। সাধারণ মানুষ যেন এই সুবিধাগুলো পুরোপুরি নিতে পারেন, সেজন্যই তারা এই সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছেন।

জনসচেতনতা বাড়ানোর এই ক্যাম্পেইনে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদেরও যুক্ত করেন আয়োজকরা। শিশুদের মধ্যে গ্রাম আদালত সম্পর্কে ধারণা দিতে আগে থেকেই কুইজ ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন তারা। শিক্ষার্থীরা তাদের আঁকা ছবিতে গ্রামের বিচার ব্যবস্থার সুন্দর রূপ ফুটিয়ে তোলে। ভিডিও শো শেষ হওয়ার পর এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাতে আকর্ষণীয় পুরস্কার তুলে দেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। আয়োজকরা মনে করেন, শিশুরা এই বিষয়গুলো জানলে তারা নিজেদের পরিবার ও প্রতিবেশীদের মাঝেও এই বার্তা খুব সহজে পৌঁছে দিতে পারবে।

অনুষ্ঠানে এলাকার ইউপি সদস্য, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং প্রচুর নারী-পুরুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। আলোচনা পর্বে বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, দেশের আইন সবার জন্য সমান। গরিব মানুষ টাকার অভাবে বিচার পাবে না, এমন দিন এখন আর নেই। সরকার গ্রাম আদালতকে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী করেছে এবং এর আইনি ক্ষমতাও বাড়িয়েছে। তাই দালালদের খপ্পরে পড়ে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে নিজের শেষ সম্বলটুকু নষ্ট না করে সবাইকে গ্রাম আদালতের সুবিধা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা। বক্তারা আরও বলেন, গ্রামের মানুষ যত বেশি সচেতন হবেন, সমাজ থেকে দালালদের দৌরাত্ম্য ততটাই দ্রুত কমে যাবে।

দিনব্যাপী এই চমৎকার আয়োজনের ফলে যাদবপুর ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া পড়েছে। অনেক নারী ও বয়স্ক মানুষ এই প্রথম গ্রাম আদালতের এমন সহজ ও সুন্দর নিয়মগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারলেন। তারা আয়োজকদের মন থেকে ধন্যবাদ জানান এবং ভবিষ্যতে এমন ক্যাম্পেইন আরও বেশি করার অনুরোধ করেন। সহজ, স্বল্প খরচে ও দ্রুত বিচার পাওয়ার এই বার্তাটি এখন পুরো ইউনিয়নে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ