ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর পৌর শহরে একটি তুলার জাজিম কারখানায় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দাউ দাউ করে জ্বলা এই আগুনে কারখানায় মজুত থাকা প্রায় ৩০ টন তুলা সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। চোখের সামনে নিজেদের রুটি-রুজির জায়গা এভাবে পুড়ে যেতে দেখে কারখানার মালিক ও শ্রমিকরা রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। রোববার (১৪ জুন) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কোটচাঁদপুর পৌর শহরের দুধসারা হঠাৎপাড়া এলাকায় মহাসড়কের ঠিক পাশেই অবস্থিত ওই কারখানায় এই ভয়ংকর আগুনের সূত্রপাত হয়।
ঘটনার সময় কারখানার ভেতরেই কাজ করছিলেন মালিক শাকিল আহমেদ এবং তার ৪ থেকে ৫ জন শ্রমিক। শাকিল আহমেদ অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে সাংবাদিকদের কাছে সেই সময়কার পরিস্থিতির বর্ণনা দেন। তিনি জানান, দুপুরের দিকে তারা সবাই নিজেদের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ করেই কারখানার একটি বৈদ্যুতিক মোটরের পাশ থেকে তারা কালো ধোঁয়া এবং আগুনের ফুলকি বের হতে দেখেন। তুলা অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ হওয়ায় কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে এবং এক ভয়াবহ রূপ নেয়। শ্রমিকরা প্রথমে নিজেদের চেষ্টায় আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও আগুনের তীব্রতার কাছে তারা ১০০% অসহায় হয়ে পড়েন।
আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তারা দ্রুত কোটচাঁদপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে খবর দেন। খবর পাওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায় এবং আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। কিন্তু ততক্ষণে কারখানার ভেতরে থাকা বিপুল পরিমাণ তুলা আগুনের লেলিহান শিখায় ভস্মীভূত হয়ে যায়। শাকিল আহমেদ জানান, আসন্ন শীতের বাজারের কথা মাথায় রেখে তিনি কারখানায় প্রায় ৩০ টন তুলা মজুত করেছিলেন। এই আগুনে তার প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার শুধু তুলাই পুড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রার হিসাবে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪,০০০থেকে৪,৫০০ (ডলার) এর সমান। এছাড়া কারখানার যন্ত্রপাতি ও শেডের যে ক্ষতি হয়েছে, তা হিসাব করলে লোকসানের অঙ্ক আরও অনেক বেড়ে যাবে।
এই অগ্নিকাণ্ডের ফলে কারখানা মালিক শাকিল আহমেদ এখন চরম আর্থিক ও মানসিক হতাশার মধ্যে পড়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমি অনেক স্বপ্ন নিয়ে এবং ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে অনেক কষ্ট করে এই ব্যবসাটি দাঁড় করিয়েছিলাম। এই কারখানার আয়ের ওপর আমার পুরো পরিবার এবং এখানে কাজ করা শ্রমিকদের পরিবারগুলো নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু আজকের এই আগুনে আমার সব স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ব্যাংকের ঋণের কিস্তি কীভাবে শোধ করব এবং এই বিপুল লোকসান কাটিয়ে কীভাবে আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবো, তা আমি কোনোভাবেই বুঝতে পারছি না।”
কোটচাঁদপুর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার লিডার কুতুব উদ্দিন এই অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেন। তিনি জানান, আগুনের খবর পাওয়ার পরপরই তাদের ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। তুলা এবং জাজিমের মতো দাহ্য পদার্থের কারণে আগুন খুব দ্রুত ছড়াচ্ছিল এবং নেভানো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের প্রায় দেড় ঘণ্টার একটানা এবং নিরলস চেষ্টায় আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত হস্তক্ষেপের কারণেই আগুন আশপাশের অন্য কোনো দোকান বা আবাসিক ভবনে ছড়াতে পারেনি।
আগুন লাগার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে কুতুব উদ্দিন বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো ১০০% নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে তারা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন যে, কারখানার ভেতরে থাকা কোনো বৈদ্যুতিক মোটরের শর্ট সার্কিট থেকেই হয়তো আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় প্রশাসন পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। কারখানার ভেতরে অগ্নিনির্বাপক কোনো ব্যবস্থা বা ফায়ার এক্সটিংগুইশার ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
আমাদের দেশে শিল্পকারখানাগুলোতে এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। ফায়ার সার্ভিসের একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ঘটা মোট অগ্নিকাণ্ডের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% ঘটনাই ঘটে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট বা ত্রুটিপূর্ণ ওয়্যারিংয়ের কারণে। সামান্য কিছু টাকা বাঁচাতে গিয়ে কারখানার মালিকরা অনেক সময় সস্তা ও নিম্নমানের বৈদ্যুতিক তার ব্যবহার করেন, যা পরে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ব্যাংক বা সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান যদি শাকিল আহমেদকে সহজ শর্তে নতুন করে ঋণ বা আর্থিক সহায়তা দেয়, তবে তিনি হয়তো আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস পাবেন।















