জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বিরূপ প্রভাব এখন পুরো বিশ্বকেই ভাবিয়ে তুলেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং দেশের সবুজ প্রকৃতিকে আরও সম্প্রসারণ করতে সরকার সম্প্রতি একটি বিশাল ও দূরদর্শী প্রকল্প হাতে নিয়েছে। আগামী ৫ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর এক বড় লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছে সরকার। এই বিশাল কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬ তারিখে বান্দরবানেও অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শনিবার সকালে বান্দরবান সেনানিবাস সংলগ্ন একটি সুন্দর ও উন্মুক্ত এলাকায় এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বান্দরবান জেলা প্রশাসন এবং বন বিভাগ যৌথভাবে এই চমৎকার ও পরিবেশবান্ধব আয়োজনের দায়িত্ব পালন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস। তিনি নিজ হাতে একটি আমলকী গাছের চারা রোপণ করে এই বিশাল কর্মসূচির শুভ সূচনা করেন। একটি আমলকী গাছ শুধু পরিবেশই রক্ষা করে না, এর ফল থেকে মানুষের শরীরের অনেক পুষ্টির চাহিদাও মেটে।
এই মহতী আয়োজনে জেলার শীর্ষ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা ও গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার, বান্দরবান পৌর প্রশাসক এসএম মনজুরুল হক এবং সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফা সুলতানা খান হীরামণি অন্যতম। এছাড়া বন বিভাগের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তৌফিকুল ইসলাম, পাল্পউড প্ল্যান্টেশন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইউছুফ এবং সহকারী বন সংরক্ষক রিটা আকতার। এলজিইডির রাঙ্গামাটি অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শরীফ উদ্দিন, বান্দরবানের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রতিপদ দেওয়ান এবং বান্দরবান প্রেসক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বাচ্চুও এই আয়োজনে যোগ দিয়ে পরিবেশ রক্ষার শপথ নেন।
বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চলগুলো এমনিতেই গাছপালায় ভরপুর। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবাধে পাহাড় কাটা এবং জুম চাষের কারণে অনেক বনভূমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বনভূমি কমে যাওয়ার কারণে পাহাড়ে ভূমিধস বা পাহাড় ধসের মতো মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি প্রায় ৪০% থেকে ৫০% পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এ ধরনের দুর্যোগে প্রতি বছর অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। তাই এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সাধারণ জনগণ অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। সবাই মিলে পাহাড়কে আবার সবুজে ভরিয়ে তোলার অঙ্গীকার করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত গঠনমূলক আলোচনা করেন। তারা বলেন, বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত বড় ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। সরকারের এই ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর বৃহৎ কর্মসূচি আমাদের দেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে বাঁচাতে ১০০% কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে হলে শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, সমাজের প্রতিটি মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।
বক্তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের দিকে সবার নজর আকর্ষণ করেন। তারা বলেন, শুধু ঘটা করে গাছ রোপণ করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। রোপণ করা সেই ছোট চারাগুলো যাতে গবাদিপশু বা অন্য কোনো কারণে নষ্ট না হয়, সে জন্য সেগুলোর সঠিক পরিচর্যা ও নিয়মিত সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। একটি গাছ বড় হয়ে পরিবেশকে তার শতভাগ সুবিধা দিতে বেশ কয়েক বছর সময় নেয়। তাই একটি সবুজ, সুন্দর ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে শুধু গাছ লাগানো নয়, গাছ বাঁচানোর আন্দোলনেও শামিল হওয়ার জোরালো আহ্বান জানান বক্তারা।
বান্দরবান জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এই বিশাল কর্মসূচির আওতায় পুরো বান্দরবান জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি কার্যালয়ের আঙিনা, সড়কের দুই পাশ এবং উন্মুক্ত স্থানগুলোতে পর্যায়ক্রমে লাখ লাখ গাছের চারা রোপণ করা হবে। এসব চারার মধ্যে ফলদ, বনজ ও ঔষধি প্রজাতির গাছকে সবচেয়ে বেশি প্রধান্য দেওয়া হবে। একটি পূর্ণবয়স্ক ফলদ বা বনজ গাছ কয়েক বছর পর বিক্রি করলে বা এর ফল বাজারে বিক্রি করলে অনায়াসেই ৫০থেকে১০০ (ডলার) বা ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। তাই এই গাছগুলো পাহাড়ি মানুষের জন্য শুধু পরিবেশ রক্ষাই করবে না, বরং তাদের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবেও কাজ করবে।















