নতুন কোনো চুক্তিতে না পৌঁছালে ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার কড়া হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের সামনে এখন কেবল দুটি পথ খোলা আছে—হয় তাদের একটি টেকসই চুক্তিতে আসতে হবে, নয়তো পুরোপুরি ধ্বংস ও চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ইরানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘ভালো আচরণ’ করার পরামর্শ দেন। তবে হুমকি দিলেও চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা তিনি পুরোপুরি নাকচ করে দেননি।
ট্রাম্পের এই কঠোর হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে এল, যখন সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা নতুন করে বেজে উঠেছে। গত শুক্রবার গভীর রাতে রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে অন্তত দুটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। হুতিদের মুখপাত্র আমিন হাইয়ান জানান, তাঁরা রিয়াদের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং শিল্পনগরী ইয়ানবুতে অবস্থিত সৌদির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি আরামকোর একটি তেল শোধনাগারে ড্রোন ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছেন। তাঁদের দাবি, ইয়েমেনের রাজধানী সানায় সৌদি জোটের সাম্প্রতিক বোমাবর্ষণের পাল্টা জবাব হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
হুতিদের হামলার খবর পাওয়ার পরপরই ছুটির অবকাশ অসমাপ্ত রেখে মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিড থেকে ওয়াশিংটনে ফিরে আসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের নিয়ে তিনি হোয়াইট হাউসে জরুরি বৈঠকে বসেন। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনে হুতিদের অবস্থানে সম্ভাব্য সামরিক হামলার রূপরেখা চূড়ান্ত করতেই তিনি এই তড়িঘড়ি বৈঠক ডাকেন। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সেখানে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওয়াশিংটন হুতিদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে এবং তারা সরাসরি আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে না বলে জানিয়েছে বলে দাবি করেন ট্রাম্প।
এদিকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে তেহরান জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু দেশকে ব্যবহার করে ইরানের ওপর নতুন সামরিক হামলার ছক কষছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের এক মুখপাত্র সতর্ক করে বলেছেন, কোনো প্রতিবেশী দেশ যদি ওয়াশিংটনকে তাদের আকাশসীমা বা ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে এই হামলায় ১০% সহায়তাও করে, তবে তাদের কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। তবে সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের এক শীর্ষ কূটনীতিক জানিয়েছেন, নতুন যুদ্ধ এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় পরমাণু আলোচনায় বসতে এবং সৌদি আরব ও হুতিদের চলমান বিরোধ মেটাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে তেহরান এখনো আগ্রহী রয়েছে।
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট শনিবার জানিয়েছে, রিয়াদের আকাশেই তারা হুতিদের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি সফলভাবে প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং কাতার, মিসর ও কুয়েতসহ একাধিক আরব দেশ এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক নওয়াফ ওবায়েদের ভাষ্য অনুযায়ী, হুতিদের ওপর বড় ধরনের প্রত্যাঘাতের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে সৌদি আরব। শিগগিরই তারা আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে ইয়েমেনের বিদ্রোহী ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে।
হুতিদের ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তুরস্ক। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সম্প্রতি তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সই হওয়া ঐতিহাসিক ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’-র আওতায় রিয়াদকে প্রয়োজনীয় সব সামরিক সহায়তা দিতে আঙ্কারার কোনো আপত্তি নেই। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তুরস্ক হয়তো সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ড্রোন জ্যামার, উন্নত রাডার ও সামুদ্রিক নজরদারিতে কারিগরি সহায়তা দেবে, যাতে সৌদির নিরাপত্তা ১০০% নিশ্চিত করা যায়।
মধ্যপ্রাচ্যে এই সামরিক উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০$ ছাড়িয়ে যাওয়ার বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের বিমা খরচ ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় প্রায় ২৫% থেকে ৩০% পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যার বড় ধাক্কা লাগছে সাধারণ মানুষের ওপর। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে দ্রুত নিরসন করা না গেলে পুরো অঞ্চল এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
















