রাজধানী ঢাকায় একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ও যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জনমনে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শুক্রবার দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শহরের অন্তত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এক ডজনেরও বেশি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তরা। একই সাথে রাত ১০টার দিকে মিরপুরের কাফরুল থানার ঠিক সামনে রাখা একটি খালি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয় অজ্ঞাত ব্যক্তিরা। এর কিছুক্ষণ পরই রামপুরায় অবস্থিত বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবনের সামনে আরও দুটি ককটেল ফাটিয়ে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। এসব ঘটনায় এক অটোরিকশাচালক গুরুতর আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
কাফরুল থানা পুলিশ জানায়, থানার কাছে পার্কিং করা একটি ফাঁকা বাসে দুর্বৃত্তরা আগুন লাগিয়ে পালিয়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা স্থানীয়দের সহায়তায় দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। অগ্নিকাণ্ডে বাসটির প্রায় ৮০% অংশ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যার আনুমানিক আর্থিক ক্ষতি কয়েক হাজার ডলার ($)-এর সমান। ডিএমপির মিরপুর অঞ্চলের সহকারী কমিশনার আবুল বাসার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, কারা বাসে আগুন দিয়েছে তা খতিয়ে দেখছেন তাঁরা। এদিকে রামপুরায় বিটিভি ভবনের প্রধান ফটকে বিস্ফোরণের তীব্র শব্দে আশপাশের সাধারণ মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করেন।
এর আগে দুপুর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত শহরের মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, বাবুবাজার ও মগবাজারে ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ঘটে। জুমার নামাজের পরপরই মালিবাগের সোহাগ বাস কাউন্টারের সামনে দুটি শক্তিশালী ককটেল ফাটানো হয়। এরপর সন্ধ্যা সোয়া ছয়টায় আগারগাঁওয়ে বেতার ভবনের সামনে, সাড়ে ছয়টায় মহাখালীতে, রাত আটটায় বাবুবাজার ব্রিজের নিচে এবং নয়টায় মগবাজার মোড়ে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আগারগাঁওয়ের ঘটনাটি ছাড়া বাকি স্থানগুলোতে চলন্ত ফ্লাইওভার বা উড়ালসড়কের ওপর থেকে নিচের সড়ক লক্ষ্য করে ককটেলগুলো ছুড়ে মারা হয়।
শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে সবচেয়ে বড় নাশকতার শিকার হয় যাত্রাবাড়ী এলাকা। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় যাত্রাবাড়ী থানার প্রধান ফটকের সামনে প্রথম ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। এর কিছুক্ষণ পর যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তার ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে আরও তিনটি ককটেল ফাটায় দুর্বৃত্তরা। এতে ইবাদুর রহমান নামের এক নিরীহ অটোরিকশাচালক রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পুলিশ ও স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠায়। যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ রাজু জানান, পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্তের কাজ চলছে।
পুলিশের ধারণা, সম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সংগঠিত হয়ে পরিকল্পিতভাবে রাজধানীতে এই ত্রাস সৃষ্টি করছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর গুলশানে নিষিদ্ধ এই দলের শত শত নেতাকর্মী আকস্মিক ঝটিকা মিছিল বের করেছিলেন। সে সময় তাঁরা রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দিয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ করেন। পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে এবং ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি তাজা ককটেল উদ্ধার করে। ওই ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত ৮৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে গুলশানের নিরাপত্তা ব্যর্থতার কারণে গত ১৬ সেপ্টেম্বর গুলশান বিভাগের ডিসি ও ওসিসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, গত মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত শীর্ষ আসামির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন। এই ঐতিহাসিক রায়ের পর থেকেই দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির অপচেষ্টা শুরু হয়। রায়ের মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে এবং গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় পরপর তিনটি ককটেল ফাটিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করা হয়। শুক্রবারের ধারাবাহিক হামলা তারই অংশ বলে ধারণা নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, নগরবাসীর শতভাগ (১০০%) নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নাশকতাকারীদের মদদদাতা ও অর্থের জোগানদাতাদের ধরতে পুলিশ ইতিমধ্যে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। পুরো রাজধানীতে পুলিশি তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে এবং ফ্লাইওভারগুলোতে টহল জোরদার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার কোনো অপচেষ্টা বরদাশত করা হবে না বলে ডিএমপি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।
















