বর্তমান যুগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। এই যুগে যে দেশ প্রযুক্তিতে যত উন্নত, সেই দেশের অর্থনীতি তত বেশি শক্তিশালী। আমাদের দেশের তরুণরাও এখন আর মেধা বা চিন্তায় পিছিয়ে নেই। তাদের মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা নতুন নতুন আইডিয়া বা উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনাগুলো বাস্তবে রূপ দিতে দরকার শুধু একটু সঠিক দিকনির্দেশনা ও ভালো একটি মঞ্চ। শিক্ষার্থীদের এই মেধা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ ঘটাতে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় এক চমৎকার প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে উপজেলা প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (১২ জুন) উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে দিনব্যাপী “স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং” নামের এই আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে।
এই ব্যতিক্রমী ও শিক্ষামূলক প্রদর্শনীতে শৈলকুপা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মোট ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে ছিল ১৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২টি কলেজ এবং ১টি মাদ্রাসা। সকাল থেকেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নিজেদের তৈরি নানা প্রজেক্ট বা প্রকল্প নিয়ে অডিটোরিয়ামে হাজির হন। পুরো অডিটোরিয়াম জুড়ে তখন এক উৎসবের আমেজ বিরাজ করছিল। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ নিজেদের মেধা খাটিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী ধারণা এবং ভবিষ্যতের জন্য দারুণ সব স্টার্টআপ মডেল দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপন করে। তাদের এই অসাধারণ কাজগুলো দেখে অনুষ্ঠানে আসা সবাই রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে যান।
প্রদর্শনীতে শিক্ষার্থীরা দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যা সমাধানের সহজ উপায় তাদের প্রজেক্টের মাধ্যমে তুলে ধরে। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব আধুনিক প্রযুক্তি, কৃষিকাজে নতুন যন্ত্রের ব্যবহার, তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সোলার এনার্জির ওপর তারা সবচেয়ে বেশি জোর দেয়। কৃষিনির্ভর এই দেশের কৃষকরা অনেক সময় সঠিক প্রযুক্তির অভাবে তাদের ফসলের প্রায় ২০% থেকে ৩০% নষ্ট হতে দেখেন। শিক্ষার্থীরা এমন কিছু স্মার্ট সেন্সর ও কৃষি মডেল দেখিয়েছে, যা ব্যবহার করলে কৃষকের খরচ অনেক কমে যাবে। এছাড়া পরিবেশ দূষণ কমিয়ে কীভাবে অল্প খরচে বিদ্যুৎ তৈরি করা যায়, তারও চমৎকার কিছু মডেল সেখানে দেখা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব স্টার্টআপ আইডিয়া যদি ভবিষ্যতে বড় পরিসরে কাজে লাগানো যায়, তবে দেশ প্রতি বছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) সাশ্রয় করতে পারবে।
এই জমকালো আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের মনে আরও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস জোগান শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহফুজুর রহমান। তিনি প্রতিটি স্টল ঘুরে ঘুরে শিক্ষার্থীদের প্রজেক্টগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেন এবং তাদের কাজের প্রশংসা করেন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বর্তমান আধুনিক বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা এখন বিশ্বমানের মেধা রাখে। শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে উৎসাহিত করতে উপজেলা প্রশাসনের এই ধরনের আয়োজন ভবিষ্যতেও অনেক বড় ভূমিকা রাখবে। তিনি তরুণদের শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেদের মেধা দিয়ে নতুন নতুন স্টার্টআপ বা ব্যবসা নিয়ে কাজ করার জোরালো আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শৈলকুপা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. বাকী বিল্লাহ। তিনি তার বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশের বেকারত্ব দূর করতে হলে তরুণদের গবেষণা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়াতে হবে। শুধু পাঠ্যবই পড়ে ভালো রেজাল্ট করলেই হবে না, সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু তৈরি করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই প্রদর্শনীর মতো কার্যক্রমগুলো আমাদের শিক্ষার্থীদের আগামী দিনে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে ১০০% সাহায্য করবে। শিক্ষার্থীরা যদি এখন থেকেই স্টার্টআপের ধারণা পেয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে তারা দেশে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে।
প্রদর্শনীতে নিয়ে আসা প্রকল্পগুলোর মান যাচাই করার জন্য একটি দক্ষ বিচারক প্যানেল কাজ করেছে। বিচারকরা প্রতিটি প্রজেক্টের কার্যকারিতা, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, তাদের উপস্থাপনার ধরন এবং এই আইডিয়াগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করার সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মূল্যায়ন করেন। যেসব প্রজেক্ট বাস্তবে কাজে লাগিয়ে মানুষের জীবন সহজ করা সম্ভব, সেগুলোকে তারা বাড়তি পয়েন্ট দেন। অনেক শিক্ষার্থী তাদের প্রজেক্ট এমনভাবে বুঝিয়েছে যে, মনে হচ্ছিল তারা যেন একেকজন পেশাদার বিজ্ঞানী বা তরুণ উদ্যোক্তা। শিক্ষার্থীদের এমন আত্মবিশ্বাস দেখে অনুষ্ঠানে আসা অভিভাবক ও শিক্ষকরা দারুণ খুশি হয়েছেন।
দিনব্যাপী চলা এই বিজ্ঞান ও স্টার্টআপ প্রদর্শনীতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ নানা শ্রেণি-পেশার শত শত মানুষ ভিড় করেন। তারা ঘুরে ঘুরে ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীদের এই কাজগুলো দেখেন এবং তাদের উৎসাহ দেন। আধুনিক বিশ্বে যখন প্রযুক্তি সবকিছু দখল করে নিচ্ছে, তখন আমাদের তরুণদের এমন বিজ্ঞানচর্চা সত্যিই একটি আশার আলো। সংশ্লিষ্ট সবাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, শৈলকুপার শিক্ষা অঙ্গনে বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনচর্চাকে এই আয়োজন আরও অনেক বেশি বেগবান করবে। আগামী দিনে এই তরুণেরাই হয়তো এমন কোনো প্রযুক্তি বা স্টার্টআপ তৈরি করবে, যা সারাবিশ্বে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবে এবং দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখবে।















