দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং অর্থনীতির চাকাকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্য নিয়ে একটি চমৎকার ছায়া বাজেট প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আগামী অর্থবছরের জন্য তারা ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকার এই বিকল্প বাজেট প্রস্তাব করেছে। বিলিয়ন ডলার ($) আর বড় অঙ্কের হিসাবের এই যুগে একটি রাজনৈতিক দলের এমন সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সর্বমহলে বেশ নজর কেড়েছে। এনসিপি তাদের এই বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সবচেয়ে বেশি নজর দিয়েছে।
সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের বিশাল হিসাব সহজে তুলে ধরতে এনসিপি একটি দারুণ কৌশল ব্যবহার করেছে। তারা দেখিয়েছে, একজন সাধারণ নাগরিক যদি সরকারকে ১০০ টাকা কর বা ট্যাক্স দেন, তাহলে সেই টাকার কত অংশ ঠিক কোন খাতে খরচ হবে। এই ১০০ টাকার সহজ হিসাব অনুযায়ী, এনসিপির বাজেটে সবচেয়ে বড় অংশটি যাবে দেশের শিক্ষা এবং প্রযুক্তি খাতে। তারা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ১৪.৬ টাকা শুধু এই খাতের জন্য বরাদ্দ করেছে। এর মানে হলো, বাজেটের ১৪.৬% সরাসরি শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে খরচ করবে দলটি। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে এবং বেকারত্ব দূর করে প্রযুক্তি নির্ভর তরুণ প্রজন্ম গড়তেই তারা এই খাতকে সবার ওপরে রেখেছে।
এরপরই তারা ঋণের সুদ পরিশোধের বিষয়টি সামনে এনেছে। আমরা সবাই জানি, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে নেওয়া ঋণের কারণে আমাদের অর্থনীতির ওপর বেশ বড় ধরনের চাপ রয়েছে। এনসিপি তাদের বাজেটে এই কঠিন বাস্তবতাকে স্বীকার করে প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ১৩ টাকা ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য আলাদা করে রেখেছে। পাশাপাশি দেশের কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে তারা ১১ টাকা খরচ করার সুস্পষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি মূলত রাস্তাঘাট আর যোগাযোগের ওপর নির্ভর করে। তাই তারা পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে প্রতি ১০০ টাকায় ৮.৬ টাকা বরাদ্দের কথা বলেছে।
সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো চিকিৎসাসেবা। এনসিপি তাদের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য ৬.১ টাকা বরাদ্দ রেখেছে। তারা মনে করে, দেশের প্রতিটি মানুষ যেন সহজে এবং কম খরচে ভালো চিকিৎসা পায়, সেটি রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে গ্রামের মানুষের জীবন বদলাতে এবং তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন পৌঁছে দিতে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৫.৫ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে দলটি। আমরা কৃষিপ্রধান দেশ, তাই কৃষকদের বাঁচিয়ে রাখতে এবং আধুনিক কৃষির প্রসারে তারা প্রতি ১০০ টাকায় ৩.৬ টাকা বা ৩.৬% সরাসরি কৃষি খাতে বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা সামনে এনেছে।
একটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা খুব দরকার। এনসিপি তাদের এই ছায়া বাজেটে দেশের প্রতিরক্ষা খাতের জন্য ৪.৭ টাকা বরাদ্দ রেখেছে। আবার সমাজে যারা বয়স্ক, বিধবা, এতিম বা পিছিয়ে পড়া মানুষ, তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতেও সমান ৪.৭ টাকা খরচ করার কথা বলেছে তারা। এর ফলে সমাজের অসহায় মানুষগুলো অন্যের কাছে হাত না পেতে মাথা উঁচু করে বাঁচার সুযোগ পাবে। এছাড়া শিল্পকারখানা সচল রাখতে এবং ঘরে ঘরে নিরবচ্ছিন্ন আলো জ্বালাতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ২.৯ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।
এনসিপির নীতিনির্ধারক ও নেতারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, শিক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং উৎপাদনমুখী খাতে বেশি করে টাকা বিনিয়োগ করলে দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি শক্তিশালী হবে। তারা মনে করেন, তাদের এই বাজেট দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দারিদ্র্য অনেকখানি কমিয়ে আনবে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং স্থানীয় উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানোর ফলে একেবারে তৃণমূলের সাধারণ মানুষের জীবনের মান খুব দ্রুত উন্নত হবে। রাজনীতি মানেই শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং মানুষের জন্য সঠিক পরিকল্পনা তৈরি করা, সেটিই এনসিপি প্রমান করতে চাইছে।
অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এনসিপির এই উদ্যোগকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য বেশ ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তারা বলছেন, ছায়া বাজেট আসলে সরকারের মূল বাজেটের বাইরে গিয়ে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর বিকল্প চিন্তাভাবনা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরে। এর মাধ্যমে সাধারণ ভোটাররা বুঝতে পারেন, অন্য কোনো দল ক্ষমতায় গেলে তারা দেশের টাকা ঠিক কীভাবে এবং কোন কোন খাতে খরচ করত। বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির এই প্রস্তাবিত বাজেট যদি সত্যিই বাস্তবায়ন করা যায়, তবে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং সামাজিক উন্নয়ন খাতে এক নতুন গতির সঞ্চার হবে। এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও অনেক বেশি জনবান্ধব করে তুলবে।















