মেক্সিকোর আজতেকায় জমকালো আয়োজনে শুরু ২০২৬ বিশ্বকাপ, শাকিরা জাদুতে মাতোয়ারা বিশ্ব

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বিশ্বকাপ ফুটবলের এই নতুন আসরটি নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের জল্পনা-কল্পনার কোনো শেষ নেই। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাড়ার মোড় সবখানেই এখন বিশ্বকাপ নিয়ে তুমুল তর্কবিতর্ক। রাত জেগে খেলা দেখার সেই চেনা উৎসব আবার আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে। মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামের ঠিক মাঝখানে রাখা একটি বিশাল সোনালি ট্রফি। সেই ট্রফির চারপাশে সোনালি রঙের চমৎকার পোশাক পরে নাচছেন একদল পারফরমার। তাদের পোশাকে এবং নাচের ভঙ্গিতে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে প্রাচীন আজতেক সভ্যতার সোনালি সময়। মেক্সিকান সংগীতশিল্পী লিলা ডাউনস স্টেডিয়ামের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাঁর সুমধুর কণ্ঠে পুরো বিশ্বকে স্বাগত জানিয়ে বললেন, ‘বিশ্ববাসী, মেক্সিকোতে স্বাগতম!’ আর এভাবেই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠল ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর। লাল, নীল, সবুজ আবিরের রঙে রঙিন হয়ে উঠল পুরো আজতেকা স্টেডিয়াম।

ফুটবল বিশ্বের কাছে আজতেকা স্টেডিয়াম যেন এক পবিত্র মন্দির। কারণ, ফুটবল ইতিহাসে এই প্রথম কোনো স্টেডিয়াম টানা তিনটি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করার অনন্য রেকর্ড গড়ল। এর আগে ১৯৭০ এবং ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপেরও সফল উদ্বোধন হয়েছিল এই মাঠেই। এই আজতেকা স্টেডিয়ামেই বিশ্ববাসী দেখেছিল পেলের জাদুকরী খেলা এবং ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল। তাই এই মাঠের ঘাসে মিশে আছে ফুটবলের অনেক অমর স্মৃতি। মেক্সিকোর কিংবদন্তি রক ব্যান্ড ‘মানা’ যখন মঞ্চে উঠে ‘ওই মি আমোর’ (হে, আমার ভালোবাসা) গানের সুর তুলল, তখন গ্যালারিতে বসে থাকা দর্শকরা আনন্দে মেতে উঠলেন। হাত উঁচিয়ে তারা তৈরি করলেন বিখ্যাত সেই ‘মেক্সিকান ওয়েভ’। টেলিভিশনের পর্দা পেরিয়ে দর্শকদের সেই আনন্দ ঢেউ ছুঁয়ে গেছে বাংলাদেশের লাখো ফুটবল ভক্তের হৃদয়ও।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংগীতের মূর্ছনায় দর্শকদের মাতিয়ে রাখেন ভেনেজুয়েলার গায়ক ড্যানি ওশান। এরপর মেক্সিকান মিউজিক্যাল গ্রুপ লস অ্যাঞ্জেলস আজুলস তাদের ফোক ব্যালে পারফরম্যান্স দিয়ে সবার নজর কাড়েন। তাদের পর মঞ্চ মাতাতে আসেন জনপ্রিয় কলম্বিয়ান গায়ক জে বলভিন। পারফরম্যান্সগুলো দারুণ হলেও দর্শকদের মনে হচ্ছিল কোথাও যেন একটা শূন্যতা রয়ে গেছে। কারণ, বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আসল ‘রানি’ তখনো মঞ্চে আসেননি। কোটি কোটি ভক্ত অধীর আগ্রহে শুধু একজনের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন।

অবশেষে অপেক্ষার পালা শেষ হলো। হলুদ, বেগুনি ও সাদা রঙের পোশাকে মঞ্চে উঠলেন পপসম্রাজ্ঞী শাকিরা! চোখে কালো সানগ্লাস পরে তিনি পারফরমারদের সঙ্গে নিয়ে যখন ‘দাই দাই’ গানের সুর ধরলেন, তখন আজতেকা স্টেডিয়ামে শুরু হলো বিশ্বকাপের আসল উন্মাদনা। নাইজেরিয়ান গায়ক বার্না বয়ও শাকিরার সঙ্গে দারুণভাবে সুর মেলালেন। কিন্তু পুরো গ্যালারি আর টিভির দর্শকদের সব চোখ আটকে ছিল শুধু শাকিরার দিকেই। ২০১০ বিশ্বকাপে ‘ওয়াকা ওয়াকা’ গান গেয়ে বিশ্বজুড়ে যে ঝড় তিনি তুলেছিলেন, শাকিরা ছাড়া বিশ্বকাপ যেন এখন কল্পনাই করা যায় না। তাঁর জাদুকরী পারফরম্যান্স উপস্থিত দর্শকদের ১০০% বিনোদন দিয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অলিম্পিক গেমসের মতো এক দারুণ দৃশ্য দেখা যায়। এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮টি দেশের প্রতিনিধিরা নিজেদের জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন। স্পিকারের মাধ্যমে ঘোষক প্রতিটি দেশের নাম অত্যন্ত গর্বের সাথে ঘোষণা করেন। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যখন সেই আরাধ্য সোনালি ট্রফিটি দুই হাতে উঁচিয়ে ধরেন, তখন স্টেডিয়ামের প্রায় ৮০ হাজার দর্শক একযোগে চিৎকার করে ওঠেন। এবারের বিশ্বকাপটি ফিফার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আসর, যেখানে ৪৮টি দল মোট ১০৪টি ম্যাচে লড়াই করবে। এই বিশাল আয়োজনের পেছনে ফিফা এবং আয়োজক দেশগুলো কয়েক বিলিয়ন ডলার ($) ব্যয় করেছে। নতুন এই ফরম্যাটের কারণে এশিয়া এবং আফ্রিকার অনেক নতুন দেশ বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার দারুণ সুযোগ পাচ্ছে।

স্টেডিয়ামের ভেতরে যখন এমন রঙিন উৎসব চলছিল, তখন বাইরে মেক্সিকো সিটির ফ্যান জোনগুলোতে পরিস্থিতি ছিল একেবারেই ভিন্ন। লাখ লাখ মেক্সিকান সমর্থক রাস্তায় নেমে আসেন। ফ্যান জোনে ঢোকার জন্য দর্শকদের রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৫০% বেশি মানুষ সেখানে জড়ো হওয়ায় এই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। প্রচণ্ড ভিড় আর ধাক্কাধাক্কিতে অনেকেই ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েকজন দর্শক নিরাপত্তারক্ষীদের দিকে পানির বোতল ছুড়ে মারেন এবং তাদের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। আয়োজকরা এই ফ্যান জোনগুলোর জন্য প্রচুর ডলার ($) খরচ করলেও এক হতাশ দর্শক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উন্মাদনা অবিশ্বাস্য হলেও তাদের ব্যবস্থাপনা আরও অনেক ভালো হতে পারত। ভিড় সামলাতে না পেরে স্থানীয় প্রশাসন দর্শকদের অন্য জায়গায় যাওয়ার অনুরোধ করে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে আজতেকা স্টেডিয়ামকে লাল রঙের আলোয় নতুন করে সাজানো হয়। বিভিন্ন রঙের আবির, চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা এবং বাদ্য-বাজনায় উৎসবের আমেজ চরম মাত্রায় পৌঁছায়। একটু পরই এই মাঠে উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকোর মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকা। গ্যালারিতে সবুজের সমারোহ, মেক্সিকান সমর্থকদের ভিড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘বাফানা বাফানা’ সমর্থকদের খুঁজে পাওয়াই যেন কঠিন। খেলা শুরুর ঠিক বিশ মিনিট আগে দর্শকরা গ্যালারিতে আবার সেই ঐতিহাসিক ‘মেক্সিকান ওয়েভ’ ফিরিয়ে আনেন। আজ থেকে শুরু হওয়া এই ৩৯ দিনের মহাযজ্ঞ বিশ্ববাসীকে এক সুতোয় বেঁধে রাখবে। আমাদের দেশের দর্শকদের এখন শুধু রাত জেগে এই শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচগুলো দেখার পালা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ