বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী ম্যাচ সব সময়ই একটু বিশেষ হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক মেক্সিকো এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার উদ্বোধনী ম্যাচটি শুধু ফুটবলের জন্যই নয়, বরং তিনটি লাল কার্ডের ছড়াছড়ির কারণেও ফুটবলপ্রেমীদের মনে দীর্ঘদিন গেঁথে থাকবে। গ্যালারিতে উপস্থিত প্রায় ৮৩ হাজার মেক্সিকান সমর্থকের গর্জন আর ‘মেক্সিকান ওয়েভ’-এর মাঝে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের শুভ সূচনা করেছে মেক্সিকো। এই জয়ের মাধ্যমে তারা নিজেদের ৯৬ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো উদ্বোধনী ম্যাচে জয়ের স্বাদ পেল। এর আগে সাতবার উদ্বোধনী ম্যাচ খেললেও কখনোই জয়ের মুখ দেখেনি মেক্সিকানরা।
দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য এই ম্যাচটি ছিল রীতিমতো এক দুঃস্বপ্ন। ২০১০ বিশ্বকাপে স্বাগতিক হিসেবে এই মেক্সিকোকেই তারা ১-১ গোলে আটকে দিয়েছিল। ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপে ফিরে সেই একই প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়ে এবার হার দিয়ে শুরু করতে হলো তাদের। তবে হারের চেয়েও বড় হতাশার বিষয় হলো, ম্যাচটি শেষ হওয়ার আগে তাদের দুজন খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই মেক্সিকো ছিল বেশ আক্রমণাত্মক। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই, ম্যাচের মাত্র ৮ মিনিট ৩২ সেকেন্ডে (৯ম মিনিটে) দক্ষিণ আফ্রিকার জালে বল জড়ান মেক্সিকোর ফরোয়ার্ড হুলিয়ান কিনিয়োনেস। বক্সের ভেতর থেকে তাঁর নেওয়া শটটি দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামসের দুই পায়ের ফাঁক গলে জালে আশ্রয় নেয়। বলটি হয়তো ঠেকানো সম্ভব ছিল, কিন্তু উইলিয়ামস তা পারলেন না। এই গোলটি বিশ্বকাপে মেক্সিকানদের পক্ষে প্রথম উদ্বোধনী গোল এবং বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের ইতিহাসে তৃতীয় দ্রুততম গোল। এর আগে ১৯৯৮ সালে ব্রাজিলের সিজার সাম্পাইও ৫ মিনিটে এবং ২০০৬ সালে জার্মানির ফিলিপ লাম ৬ মিনিটে গোল করেছিলেন।
প্রথমার্ধে ১-০ গোলে এগিয়ে থাকার পর, দ্বিতীয়ার্ধে মেক্সিকো আরও দাপটের সাথে খেলতে থাকে। ম্যাচের ৫০ মিনিটে মেক্সিকোর এক খেলোয়াড়কে ফাউল করার কারণে সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন দক্ষিণ আফ্রিকার মিডফিল্ডার স্ফেফেলো সিথোলে। দশ জনের দলে পরিণত হওয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ম্যাচের ৬৬ মিনিটে ঘটে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ৬৫ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন গিলবার্তো মোরা। ১৭ বছর ২৪০ দিন বয়সী মোরা মাঠে নেমেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে মেক্সিকোর সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হওয়ার রেকর্ড গড়েন। ১৯৩০ সালে ম্যানুয়েল ‘চাকেতাস’ রোসাসের গড়া ৯৬ বছরের পুরোনো রেকর্ডটি ভেঙে দেন তিনি।
মোরা মাঠে নামার পরের মিনিটেই (৬৭ মিনিটে) ডান প্রান্ত থেকে আলভারাদোর দুর্দান্ত এক পাস থেকে দারুণ হেডে গোল করে মেক্সিকোর ব্যবধান ২-০ করেন রাউল হিমিনেজ। গোল করার পর ৩৫ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের চোখে জল চলে আসে। গ্যালারিতে থাকা অনেক মেক্সিকান সমর্থকও আনন্দে কেঁদে ফেলেন।
ম্যাচের শেষ দিকটা ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। ৮৪ মিনিটে আক্রমণ করতে গিয়ে মেক্সিকোর এক খেলোয়াড়কে ফাউল করার কারণে লাল কার্ড দেখেন দক্ষিণ আফ্রিকার আরেক মিডফিল্ডার থেম্বা জেওয়ানে। ফলে দক্ষিণ আফ্রিকা ৯ জনের দলে পরিণত হয়। তবে মেক্সিকোও ১১ জন নিয়ে ম্যাচ শেষ করতে পারেনি। ইনজুরি টাইমের ২য় মিনিটে (৯০+২ মিনিট) মেক্সিকোর সেন্টার ব্যাক সেজার মন্তেসও সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে তিনটি লাল কার্ড দেখানোর ঘটনা এটাই প্রথম। তবে মেক্সিকানদের কাছে এসব লাল কার্ডের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল ৯৬ বছর পর উদ্বোধনী ম্যাচে পাওয়া ঐতিহাসিক জয়।















