ঝিনাইদহের ঐতিহাসিক স্থানগুলো পর্যটনে আকর্ষণ বাড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব লীলাভূমি, এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু আমাদের এই ব-দ্বীপে শুধু যে নদী-পাহাড় আর সমুদ্রের সৌন্দর্য আছে, তা কিন্তু নয়। এর প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে আছে হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস আর প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি শান্ত ও স্নিগ্ধ জেলা হলো ঝিনাইদহ। একসময় পর্যটনের মানচিত্রে এই জেলার নাম খুব একটা উচ্চারিত না হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে এই দৃশ্যপট একেবারেই বদলাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ঝিনাইদহের ঐতিহাসিক স্থানগুলো আজ দেশি-বিদেশি পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে নতুন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রাচীন আমলের মসজিদ, মন্দির আর সুবিশাল দিঘিগুলো যেন নীরবে অতীত দিনের গল্প বলে যায়। চলুন, জেনে নেওয়া যাক কীভাবে এই জেলার ঐতিহাসিক স্থানগুলো পর্যটনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের মনে আগ্রহের জন্ম দিচ্ছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক অজানা রত্নভান্ডার

দীর্ঘদিন ধরে পর্যটন বলতে আমরা সাধারণত কক্সবাজার, সিলেট বা পার্বত্য চট্টগ্রামকেই বুঝে এসেছি। কিন্তু যারা কোলাহলমুক্ত শান্ত পরিবেশে ইতিহাসের খুব কাছাকাছি যেতে চান, তাদের জন্য ঝিনাইদহ যেন এক অজানা রত্নভান্ডার। এই জেলার মাটি খুঁড়লেই যেন বেরিয়ে আসে সুলতানি বা মুঘল আমলের নানা স্মৃতি। আগে যাতায়াত ব্যবস্থা খুব একটা ভালো না থাকার কারণে সাধারণ মানুষ এখানে খুব সহজে আসতে পারতেন না। কিন্তু বর্তমানে সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার চমৎকার উন্নতি হওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ খুব সহজেই ঝিনাইদহে আসতে পারছেন। ছুটির দিনগুলোতে পরিবার-পরিজন বা বন্ধুদের নিয়ে মানুষ এখন ছুটে আসছেন এখানকার প্রাচীন স্থাপনাগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

প্রাচীন বারোবাজার: ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জনপদ হলো বারোবাজার। একসময় এটি ‘খলিফাতাবাদ’ বা ‘মুহম্মদাবাদ’ নামে পরিচিত ছিল। বাগেরহাটের মতো এখানেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সুলতানি আমলের অসংখ্য প্রাচীন মসজিদ। এর মধ্যে গোরার মসজিদ, নুনগোলা মসজিদ, জোড় বাংলা মসজিদ এবং পীরপুকুর মসজিদ পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে। লাল ইটের তৈরি এই মসজিদগুলোর স্থাপত্যশৈলী আর টেরাকোটার চমৎকার কাজ দেখে যে কেউ মুহূর্তেই মুগ্ধ হবেন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খননকাজের পর এই এলাকার অনেক লুক্কায়িত ইতিহাস মানুষের সামনে উঠে এসেছে। ইতিহাস গবেষক থেকে শুরু করে সাধারণ পর্যটকরা আজ এই বারোবাজারের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন।

নলডাঙ্গার রাজবাড়ি ও মন্দিরগুলোর প্রাচীন জৌলুস

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার নলডাঙ্গা একসময় ছিল বিশাল এক রাজকীয় পরগনা। কালের বিবর্তনে রাজবাড়ির মূল ভবনগুলো হয়তো আজ ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু রাজাদের তৈরি করা মন্দিরগুলো এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে রয়েছে শ্রী শ্রী তারাময়ী মাতার মন্দির, সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রাচীন স্থাপত্য। মন্দিরের গায়ে থাকা নিপুণ কারুকাজ আর চমৎকার নকশা প্রমাণ করে সে আমলের কারিগররা কতটা দক্ষ ছিলেন। বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের পাশাপাশি প্রাচীন স্থাপত্যের প্রতি যাদের প্রবল আগ্রহ রয়েছে, তারা নিয়মিত এই নলডাঙ্গা মন্দিরগুলো পরিদর্শন করতে আসেন। এটি বর্তমানে জেলার অন্যতম প্রধান একটি পর্যটন স্পট হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে।

শৈলকুপা শাহী মসজিদ ও সুফি সাধকদের স্মৃতি

ঝিনাইদহের পর্যটনে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো শৈলকুপা শাহী মসজিদ। এই দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি সুলতানি আমলে নির্মিত বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন। এর দেয়ালগুলো বেশ চওড়া এবং ওপরে রয়েছে একাধিক চমৎকার গম্বুজ, যা দূর থেকেই মানুষের চোখ আটকে দেয়। মসজিদের পাশেই রয়েছে প্রাচীন সুফি সাধকদের মাজার। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই স্থানে আসেন। শুধু মুসলমান নয়, বরং সব ধর্মের মানুষই এই প্রাচীন স্থাপনার নির্মাণশৈলী এবং শান্ত পরিবেশ উপভোগ করতে এখানে ছুটে আসেন। এটি আমাদের গ্রামীণ বাংলার এক অনন্য ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

ঢোল সমুদ্র দিঘির চারপাশের প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক মুগ্ধতা

ইতিহাসের সাথে প্রকৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায় ঝিনাইদহের বিখ্যাত ‘ঢোল সমুদ্র দিঘি’তে। সদর উপজেলার পাগলা কানাই ইউনিয়নে অবস্থিত এই সুবিশাল দিঘিটি নিয়ে রয়েছে নানা লোককথা ও মিথ। জনশ্রুতি আছে, এক প্রবল খরার সময় রাজা মুকুট রায় প্রজাদের জলকষ্ট নিবারণের জন্য এই বিশাল দিঘি খনন করেছিলেন। দিঘির টলটলে শান্ত জল আর চারপাশের সারি সারি সবুজ গাছপালা পর্যটকদের মন মুহূর্তে ভালো করে দেয়। বিকেলের স্নিগ্ধ পরিবেশে দিঘির পাড়ে বসে সময় কাটাতে অনেকেই এখানে ঘুরতে আসেন। এটি এখন স্থানীয় ও বাইরের দর্শনার্থীদের জন্য এক দারুণ ও স্বাস্থ্যকর বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা ও তরুণদের আগ্রহ

ঝিনাইদহের এই ঐতিহাসিক স্থানগুলোর পরিচিতি বাড়ার পেছনে বর্তমানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বর্তমান প্রজন্মের তরুণ ট্রাভেলার বা ভ্লগাররা এই জায়গাগুলোতে ঘুরে এসে চমৎকার সব ভিডিও ও ছবি ইন্টারনেটে শেয়ার করছেন। ড্রোন শটে তোলা প্রাচীন মসজিদের ওপরের দৃশ্য কিংবা দিঘির নীল জলরাশির ভিডিও দেখে অনেকেই এই জেলা ভ্রমণের আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তরুণ প্রজন্মের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রচারণার ফলে ঝিনাইদহ এখন আর কোনো অচেনা নাম নয়, বরং ইতিহাস অন্বেষণকারীদের কাছে একটি অতি পরিচিত ও আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্য হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় অর্থনীতিতে পর্যটনের ইতিবাচক প্রভাব

পর্যটকদের এই নিয়মিত আনাগোনা ঝিনাইদহের স্থানীয় অর্থনীতিতেও দারুণ এক ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ার কারণে প্রাচীন স্থানগুলোর আশেপাশে ছোট ছোট খাবারের দোকান, চায়ের স্টল এবং স্থানীয় হস্তশিল্পের ছোট বাজার গড়ে উঠেছে। ইজিবাইক চালক থেকে শুরু করে স্থানীয় ভ্যান চালকরাও পর্যটকদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়ে ভালো টাকা আয় করছেন। শহরের আবাসিক হোটেল ও রেস্টুরেন্টগুলোতেও আগের চেয়ে বেশি অতিথি আসছেন। পর্যটন খাতের এই নীরব বিকাশ এলাকার সাধারণ মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে দারুণভাবে সাহায্য করছে।

অবকাঠামো ও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন

এতসব আশাজাগানিয়া সম্ভাবনার মাঝেও কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। অনেক প্রাচীন স্থাপনা এখনো সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হতে বসেছে। কিছু কিছু স্থানে যাওয়ার রাস্তা এখনো খুব সরু ও ভাঙাচোরা, যা পর্যটকদের জন্য বেশ ভোগান্তির কারণ হয়। এছাড়া পরিবার নিয়ে গেলে ভালো মানের রেস্টুরেন্ট বা আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন শৌচাগারের অভাব প্রায়ই দর্শনার্থীদের চোখে পড়ে। ঝিনাইদহকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সরকারকে এই অবকাঠামোগত দিকগুলোতে দ্রুত নজর দিতে হবে। প্রাচীন স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ও আন্তরিক হতে হবে।

উপসংহার

পরিশেষে বলতে চাই, ঝিনাইদহের ঐতিহাসিক স্থানগুলো কেবল এই জেলার নয়, বরং এগুলো আমাদের পুরো বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। এগুলো শুধু ইট-পাথরের পুরনো ভবন নয়, এগুলো আমাদের শেকড় এবং হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির জীবন্ত দলিল। দীর্ঘদিনের অবহেলার চাদর সরিয়ে এই স্থানগুলো আজ যেভাবে নিজেদের স্বমহিমায় পর্যটকদের আকর্ষণ করছে, তা সত্যিই আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। আমরা যদি একটু সচেতন হই, সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন যদি সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসে, তবে ঝিনাইদহ খুব সহজেই বাংলাদেশের অন্যতম সেরা হেরিটেজ ট্যুরিজম বা প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। আসুন, আমরা আমাদের এই অমূল্য ইতিহাসকে সযত্নে রক্ষা করি এবং আগামী প্রজন্মের কাছে সগর্বে তুলে ধরি। ইতিহাস বাঁচলে, বেঁচে থাকবে আমাদের শেকড় আর ঐতিহ্য।


সম্পর্কিত নিবন্ধ