খুব বেশি আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণের খেলা এটি ছিল না। চোখধাঁধানো ফুটবল জাদুকরি কোনো প্রদর্শনীও দর্শকরা এই ম্যাচে দেখতে পাননি। দুই দলই মাঠে নেমেছিল আগে নিজেদের ঘর সামলে তারপর সুযোগ বুঝে প্রতিপক্ষের ওপর আঘাত হানার কৌশল নিয়ে। কিন্তু দিন শেষে এসব কৌশল আর হিসাব-নিকাশ ছাপিয়ে লন্ডনের এমিরেটস স্টেডিয়াম ভেসেছে বাঁধভাঙা উল্লাসে। উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগের রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে স্প্যানিশ ক্লাব আতলেতিকো মাদ্রিদকে ১-০ গোলে হারিয়েছে আর্সেনাল। প্রথম লেগের খেলা ১-১ গোলে ড্র হয়েছিল। ফলে দুই লেগ মিলিয়ে ২-১ ব্যবধানের দারুণ এক জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে কোচ মিকেল আরতেতার শিষ্যরা। আর এই জয়ের মাধ্যমেই পুরো ২০ বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ওঠার টিকিট নিশ্চিত করল ইংলিশ জায়ান্ট আর্সেনাল। নিজেদের ক্লাব ইতিহাসে এর আগে কেবল ২০০৬ সালেই একবার এই টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলেছিল তারা।
নর্থ লন্ডনে আতলেতিকো মাদ্রিদের মুখোমুখি হওয়ার আগে মানসিকভাবে আর্সেনাল বেশ এগিয়ে ছিল। চলতি মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে এখন পর্যন্ত একটি ম্যাচেও হারেনি মিকেল আরতেতার এই তরুণ দল। নিজেদের ঘরের মাঠে খেলা আগের ম্যাচগুলোতে তারা কোনো গোলও হজম করেনি। তাই কোচ আরতেতা আজ নিজেদের রক্ষণভাগ নিশ্ছিদ্র রেখে অন্তত একটি গোল বের করে আনার দিকেই পুরো মনোযোগ দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, লিগ পর্বে এই এমিরেটস স্টেডিয়ামেই ৪-০ গোলে হারের এক তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল আতলেতিকোর। তাই ডিয়েগো সিমিওনের দলও প্রথম থেকে বেশ সতর্ক ফুটবল খেলছিল। তারা নিজেদের সীমানায় কড়া পাহারা বসিয়ে আর্সেনালের আক্রমণগুলো আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে।
রক্ষণভাগ আর মাঝমাঠের এই প্রবল লড়াইয়ে দুই দলই বেশ সমান তালে লড়েছে। ম্যাচে বল দখলের লড়াইয়ে আর্সেনাল প্রায় ৫৫% সময় বল নিজেদের পায়ে রাখে। তবে প্রথমার্ধের একেবারে শেষ দিকে গিয়ে স্বাগতিক আর্সেনাল তাদের বহু কাঙ্ক্ষিত গোলটি আদায় করে নেয়। ভিক্টর গিওকেরেস মাঝমাঠ থেকে দারুণ এক বল বাড়িয়ে দেন লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ডের দিকে। ট্রোসার্ড বক্সে ঢুকে কোনাকুনি এক জোরালো শট নেন। আতলেতিকোর অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ইয়ান ও’ব্লাক বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই শট কোনোমতে আটকে দেন। কিন্তু বলটি তিনি পুরোপুরি বিপদমুক্ত করতে পারেননি। ঠিক সামনেই ওত পেতে দাঁড়িয়ে ছিলেন বুকায়ো সাকা। ফিরতি বল পেয়ে তিনি আলতো ট্যাপ করে বল সোজা জালে জড়িয়ে দেন। এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগে এটি সাকার তৃতীয় গোল। এই গোলের সুবাদে আর্সেনাল শিবির দারুণ উজ্জীবিত হয়ে বিরতিতে যায়।
দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হতেই আতলেতিকো মাদ্রিদ গোল শোধ করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা আর্সেনালের রক্ষণভাগে প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে। ম্যাচের ৫১ মিনিটে গিলিয়ানো সিমিওনে বক্সের ভেতর বল পেয়েও শট নিতে দেরি করে ফেলেন, ফলে একটি নিশ্চিত সুযোগ হাতছাড়া হয়। ঠিক পরের মুহূর্তেই তিনি গ্যাব্রিয়েলের ফাউলের শিকার হয়ে মাটিতে পড়ে যান। আতলেতিকোর খেলোয়াড়রা পেনাল্টির জোরালো আবেদন করেন। কিন্তু ভিএআর রেফারি পরীক্ষা করে জানান, সেখানে পেনাল্টি দেওয়ার মতো কোনো অপরাধ ঘটেনি। এর ঠিক পাঁচ মিনিট পর ফরাসি তারকা আঁতোয়ান গ্রিজমান দারুণ এক শট নেন। কিন্তু আর্সেনালের গোলরক্ষক ডেভিড রায়া অবিশ্বাস্য দক্ষতায় সেই শট রুখে দিলে আতলেতিকোর হতাশা আরও বাড়ে।
আতলেতিকো চাপ দিলেও ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে গোলের সবচেয়ে সহজ সুযোগটি কিন্তু আর্সেনালই তৈরি করেছিল। ম্যাচের ৬৬ মিনিটে পিয়েরে ইনকাপিয়ে বাঁ প্রান্ত থেকে দারুণ একটি ক্রস ফেলেন ডি-বক্সে। সেখানে বল পেয়ে যান ভিক্টর গিওকেরেস। কিন্তু গতির ওপর থাকা এই সুইডিশ ফরোয়ার্ড বলটি ঠিকমতো লক্ষ্যে রাখতে পারেননি। তার নেওয়া শট ক্রসবারের সামান্য ওপর দিয়ে মাঠের বাইরে চলে যায়। এরপর ম্যাচের বাকি সময়ে দুই দলই আপ্রাণ চেষ্টা করে, কিন্তু আর কোনো গোলের দেখা মেলেনি। শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগে অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হয়। আর সেই বৃষ্টির মধ্যেই এমিরেটস স্টেডিয়ামের হাজার হাজার সমর্থক তাদের প্রিয় দলের জয়োৎসব শুরু করেন।
এই জয় আর্সেনালের জন্য শুধু মাঠের সাফল্যই নয়, বিশাল এক আর্থিক প্রাপ্তিও বটে। চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ওঠার কারণে উয়েফার প্রাইজমানি ও টিভি সম্প্রচার স্বত্ব থেকে ক্লাবটি প্রায় ১২৫ মিলিয়ন $ (ডলার) আয় করবে। ক্লাবের জার্সি ও অন্যান্য স্পনসরশিপ আয় এক ধাক্কায় প্রায় ৩০% বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে যেখানে আর্সেনালের বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে, সেখানে ক্লাবের জনপ্রিয়তা আরও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। দীর্ঘ দুই দশক পর এই অর্জন ক্লাবের অর্থনীতি ও ভাবমূর্তিতে এক বিশাল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এখন আর্সেনাল ও বাংলাদেশের গানার ভক্তদের নজর আগামী ৩০ মে তারিখের দিকে। হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত হবে এবারের উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের মহাগুরুত্বপূর্ণ ফাইনাল। সেখানে আর্সেনালের প্রতিপক্ষ হবে জার্মান পরাশক্তি বায়ার্ন মিউনিখ অথবা ফরাসি চ্যাম্পিয়ন পিএসজি। ২০০৬ সালের ফাইনালে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার কাছে হেরে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন ভেঙেছিল আর্সেনালের। এবার আরতেতার এই তরুণ দল সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় পরতে পারবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
















