মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির খোঁজে ইরানের ১৪ দফা, অন্যদিকে ট্রাম্পের নতুন হামলার হুমকি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধ করতে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে ইরান। শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং দীর্ঘদিনের এই সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৪ দফার একটি শান্তি পরিকল্পনা পেশ করেছে। লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে এই মুহূর্তেই যুদ্ধ চিরতরে বন্ধ করা তাদের প্রধান লক্ষ্য। ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই খবরটি জানিয়েছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র কিছুদিন আগে ইরানকে ৯ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব দিয়েছিল। তেহরান সেই প্রস্তাবের পাল্টা জবাব হিসেবেই নিজেদের শর্তগুলো দিয়ে এই ১৪ দফা পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটি এখন বন্ধুরাষ্ট্র পাকিস্তান সরকারের সরাসরি মধ্যস্থতায় এগোচ্ছে।

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি তেহরানে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের ডেকে একটি সম্মেলনে তাদের দেশের অবস্থান একদম পরিষ্কার করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, তারা চাপিয়ে দেওয়া এই অন্যায্য যুদ্ধের একটি স্থায়ী অবসান চান এবং সে কারণেই পাকিস্তানের কাছে এই রূপরেখা জমা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এখন বল পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে। তারা আলোচনার পথে হাঁটবে নাকি ধ্বংসাত্মক সংঘাত আরও বাড়াবে, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাদেরই নিতে হবে। তাসনিম নিউজের তথ্য মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনা চালিয়ে নিতে দুই মাসের সময় চেয়ে একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ইরান সেই প্রস্তাব নাকচ করে কড়া ভাষায় জানিয়েছে, যাবতীয় সমস্যার সমাধান আগামী ৩০ দিনের মধ্যেই শেষ করতে হবে।

ইরান তাদের দেওয়া এই নতুন শান্তি পরিকল্পনায় বেশ কিছু কঠিন ও সুনির্দিষ্ট শর্ত জুড়ে দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, ভবিষ্যতে ইরানের মূল ভূখণ্ডে কোনো প্রকার সামরিক আগ্রাসন চালানো হবে না, যুক্তরাষ্ট্রকে তার ১০০% নিশ্চয়তা দিতে হবে। পাশাপাশি, ইরানের সীমান্তবর্তী সব এলাকা থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে দ্রুত প্রত্যাহার করতে হবে। এর বাইরেও তাদের বড় অর্থনৈতিক দাবি রয়েছে। ইরানের ওপর থেকে দীর্ঘদিন ধরে চলা নৌ-অবরোধ ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নিতে হবে। বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সব সম্পদ ও প্রতিটি ডলার ($) অবিলম্বে তেহরানকে ফেরত দিতে হবে। এছাড়া লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে সংঘাতের অবসান ঘটাতে হবে। বিনিময়ে ইরান হরমুজ প্রণালি সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে তারা নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এখন কোনো আলোচনা করতে চায় না।

ইরান যখন শান্তির রূপরেখা নিয়ে কথা বলছে, ঠিক তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিচ্ছেন নতুন করে হামলার কড়া হুমকি। ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মেজাজে কথা বলেন। ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখা সম্পর্কে অবগত আছেন এবং এখন চূড়ান্ত লিখিত খসড়া হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু তিনি হুঁশিয়ার করে দেন যে, ইরান যদি কোনো ধরনের ‘অসদাচরণ’ করে, তবে দেশটিতে আবারও ভয়াবহ সামরিক হামলা চালানো হবে। তিনি বলেন, ইরান অতীতে যা করেছে, তার জন্য তারা এখনো যথেষ্ট মূল্য দেয়নি। তারা খারাপ কিছু করলে অবশ্যই হামলার বড় ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এড়িয়ে তাদের এই ১৪ দফা প্রস্তাব মেনে নেবে কি না, তা নিয়ে এখনো আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের ধোঁয়াশা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির পাশাপাশি ইরান এখন ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের জোর চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সম্প্রতি ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারোর সঙ্গে টেলিফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছেন। ফোনালাপে আরাগচি ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে যুদ্ধ বন্ধে তেহরানের নেওয়া নানা কৌশলগত উদ্যোগ ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের কথা বিস্তারিতভাবে জানান। তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকে অঞ্চলজুড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করার অনুরোধ করেন। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারোও চলমান এই কূটনৈতিক আলোচনা ও শান্তি উদ্যোগের প্রতি তার দেশের পূর্ণ সমর্থন জানান। তিনি আন্তরিকভাবে আশা প্রকাশ করেন যে, দুই পক্ষের মধ্যে এই আলোচনা খুব শিগগিরই মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনবে।

কূটনৈতিক এই তৎপরতার মধ্যেই মাঠের যুদ্ধ এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর এখনো ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। লেবাননের ভূখণ্ডে ঢুকে পড়া ইসরায়েলি বাহিনীর বিভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করে তারা একের পর এক জোরালো হামলা চালাচ্ছে। এই রক্তক্ষয়ী অভিযানে তারা ইসরায়েলের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করার দাবি করেছে। হিজবুল্লাহ প্রকাশ্যে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, রণাঙ্গনের বেশ কিছু ইসরায়েলি সামরিক অবস্থানে তারা আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং ভারী কামান থেকে অনবরত গোলাবর্ষণ করেছে। বিয়াদা শহরে ইসরায়েলি সেনা ও সামরিক যানের দুটি আলাদা অবস্থানে তারা সরাসরি আঘাত হেনেছে। এছাড়া একই এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর একটি বড় ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতেও তারা আধুনিক ড্রোন দিয়ে সফলভাবে আঘাত হেনেছে।

হিজবুল্লাহর লড়াকু যোদ্ধারা আল-কান্তারা শহরের জুনেইজেল পাহাড়ে অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করেও ভারী কামানের গোলাবর্ষণ করেছে। বিয়াদা শহরে থাকা ইসরায়েলি সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করার দাবিও করেছে তারা। একদিকে শান্তির জন্য ১৪ দফার প্রস্তাব, অন্যদিকে রণাঙ্গনে মুহুর্মুহু ড্রোন আর কামানের গোলা—এই দুইয়ে মিলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন চরম উত্তেজনাকর একটি অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনীও লেবাননে তাদের যুদ্ধবিমান দিয়ে মারাত্মক পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছে এবং হাজার হাজার নিরীহ পরিবার নিজেদের বাড়িঘর হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে এই মানবিক সংকট আরও চরম আকার ধারণ করবে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই ভয়াবহ যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনেও প্রবল দুশ্চিন্তা কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের ওই অঞ্চলে আমাদের দেশের লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিক দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন। সেখানে যুদ্ধের আগুন যদি আরও ছড়িয়ে পড়ে, তবে এই মানুষগুলোর কর্মসংস্থান মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। দেশে রেমিট্যান্স আসা অনেক কমে যাবে। এছাড়া এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলে অনেক বেড়ে যেতে পারে। তখন আমাদের তেল কিনতে গিয়ে বাড়তি মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) খরচ করতে হবে। এতে মূল্যস্ফীতি অন্তত ১০% থেকে ১৫% বেড়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হবে। তাই আগামী ৩০ দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চুক্তির ওপর আমাদের দেশের অর্থনীতিও অনেকখানি নির্ভর করছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ