ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মূল আকাঙ্ক্ষা এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের একদফা দাবিতে ঝিনাইদহে ১১ দলীয় জোট এক বিশাল গণমিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে। শনিবার, ২ মে বিকেলে ঝিনাইদহ জেলা শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো সাধারণ মানুষের স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে আয়োজিত এই সমাবেশ সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে গভীর আশার সঞ্চার করেছে। আগামী দিনের রাজনীতি কেমন হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।
বিকেল ঠিক ৪টার দিকে জেলা জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়ের সামনে থেকে এই গণজমায়েত শুরু হয়। দেখতে দেখতে সেখানে জোটভুক্ত বিভিন্ন দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে যোগ দেন। উপস্থিত মানুষের ভিড় ও উন্মাদনা দেখে মনে হচ্ছিল, ওই এলাকার প্রায় ৯০% মানুষ যেন নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য আজ এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছেন। গত জুলাই মাসের রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার বিপ্লবে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের সেই মহান আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই মূলত মানুষ আজ এতটা আবেগপ্রবণ হয়ে রাজপথে নেমে এসেছেন।
এই বিশাল সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অত্যন্ত জোরালো ও সাহসী কণ্ঠে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং অঞ্চল পরিচালক মো. মোবারক হোসাইন। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত নতুন এই বাংলাদেশ কোনো অপশক্তির কাছে আর মাথা নত করবে না। ছাত্র-জনতার সেই ঐতিহাসিক বিপ্লবের ১০০% সুফল দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষের ঘরে তুলতে হলে অবিলম্বে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন করতে হবে। এই একদফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ১১ দলের এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন রাজপথে একইভাবে চলতে থাকবে বলে তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দেন।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ঝিনাইদহ-২ আসনের সংসদ সদস্য এবং জেলা আমির অধ্যাপক আলী আজম মোহাম্মদ আবু বকর। তার সাথে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন ঝিনাইদহ-৩ আসনের অধ্যাপক মতিয়ার রহমান এবং ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবু তালিব। তারা তাদের বক্তব্যে বলেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকার দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করে হাজার হাজার মিলিয়ন ডলার ($) বিদেশে পাচার করেছে, যার নেতিবাচক প্রভাবে দেশে এখন চরম আর্থিক সংকট চলছে। লুটপাট হওয়া সেই অর্থনীতিকে আবার নিজ পায়ে দাঁড় করাতে এবং দেশে একটি বৈষম্যহীন ও ইনসাফপূর্ণ সমাজ গড়তে এই সনদের কোনো বিকল্প নেই। তারা দেশের প্রতিটি নাগরিককে যেকোনো মূল্যে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
জোটের অন্যান্য শরিক দলের শীর্ষ নেতারাও এই বিশাল সমাবেশে নিজেদের জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন। তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলা আমির ড. হাবিবুর রহমান, হরিণাকুণ্ডু উপজেলা আমির বাবুল আক্তার, শৈলকুপা উপজেলা আমির এস এম মতিউর রহমান এবং কোটচাঁদপুর উপজেলা আমির তাজুল ইসলাম। এছাড়া ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টির (এনসিপি) জেলা সদস্যসচিব আরেফিন কায়ছার, খেলাফত মজলিসের জেলা সভাপতি মাওলানা মিজানুর রহমান, এবি পার্টির জেলার সাধারণ সম্পাদকবৃন্দ এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের জেলা সভাপতি ওবায়দুল রহমানসহ শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম ও প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা সেখানে অত্যন্ত উদ্দীপনামূলক বক্তব্য রাখেন।
নেতাদের দীর্ঘ বক্তৃতা পর্ব শেষ হওয়ার পর হাজার হাজার মানুষের বিপুল অংশগ্রহণে একটি বিশাল গণমিছিল পুরো শহর প্রদক্ষিণ করে। মিছিলটি যখন শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এবং বিখ্যাত পায়রা চত্বরসহ গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো পার হচ্ছিল, তখন পুরো এলাকা মিছিলে থাকা মানুষের স্লোগানে কেঁপে ওঠে। মিছিলে নানা বয়সের মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। নারী, পুরুষ ও তরুণ প্রজন্মসহ অংশগ্রহণকারী সবাই একসুরে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করো’ এবং ‘শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষও হাত নেড়ে তাদের এই দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান।
সমাবেশ ও মিছিলের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে বক্তারা দেশি-বিদেশি সব অপশক্তির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তারা বলেন, সাধারণ মানুষ অনেক কষ্ট করে এই দেশ থেকে ফ্যাসিবাদ দূর করেছে। তাই তারা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন, জুলাই বিপ্লবের পর দেশবিরোধী কোনো চক্রান্ত দেশের মুক্তিকামী মানুষ আর কখনোই সহ্য করবে না। তারা সরকারকে দ্রুত সব ধরনের সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ করে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের জন্য কাজ করার জোরালো তাগিদ দেন। সবশেষে মাগরিবের আজানের ঠিক আগে দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে নেতারা এই বিশাল কর্মসূচির সমাপ্তি টানেন।
















