তেলের দাম বৃদ্ধির পরেও ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, সরকার বাড়াচ্ছে সরবরাহ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে প্রতি লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ার পরেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমছে না। রোববারও মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিলিং স্টেশনের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তেল কিনতে দেখা গেছে। সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—দাম তো বাড়ল, কিন্তু তেলের সরবরাহ কি স্বাভাবিক হবে?

জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) অবশ্য আশ্বস্ত করেছে যে দেশে তেলের মজুত যথেষ্ট ভালো আছে। সংকট কাটাতে সরকার তেল সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিপিসির অধীনে থাকা কোম্পানিগুলোকে এখন থেকে ২০% বেশি অকটেন এবং ১০% বেশি পেট্রল ও ডিজেল সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। রোববারের এই নির্দেশনার ফলে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানিগুলো সোমবার থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে বাড়তি তেল সরবরাহ শুরু করবে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের শুরু মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে হামলা চালানোর পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। সে সময় সরকার তেলের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ১৬ এপ্রিল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “বিশ্বের সব দেশে তেল-ডিজেলের দাম বাড়ানো হলেও আমরা জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে এখন পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত নিইনি। এ খাতে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে হলেও সরকার চেষ্টা করছে আন্তরিকভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে”[1]।

তবে মাস শেষ হওয়ার আগেই সরকার গত শনিবার রাতে হঠাৎ তেলের দাম বাড়ায়। ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বেড়ে ১১৫ টাকা, অকটেনের দাম ২০ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বেড়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে চড়া দামে তেল কিনে মজুত করতে গিয়ে সরকারের যে বাড়তি খরচ হয়েছে, তা সামান্য সমন্বয় করতেই দাম বাড়ানো হয়েছে।

দেশে জ্বালানি তেল বিক্রি করে সরকার ও বিপিসি বিশাল অংকের মুনাফা করে থাকে। জ্বালানি তেলের ওপর সরকার ২০% থেকে ২৫% পর্যন্ত কর বসায়, যা থেকে প্রতি বছর প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি প্রায় ৩,৯৪৩ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছিল। গত এক দশকে ৯ বছরই তারা লাভের মুখ দেখেছে। শুধু ২০২১-২২ অর্থবছরে ২,৭০০ কোটি টাকা লোকসান হয়। বিপিসির সূত্র মতে, এবারের তেলের নতুন দামের ফলে তাদের মাসে বাড়তি ৭৫০ কোটি টাকা আয় হবে, যার মধ্যে শুধু ডিজেল থেকেই আসবে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা।

তেলের মজুত নিয়ে জ্বালানি বিভাগ বেশ আশাবাদী। বর্তমানে দেশে ১ লাখ ২ হাজার টন ডিজেল মজুত আছে এবং আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আরও ৪ লাখ ৭৮ হাজার টন ডিজেল আসার কথা। অকটেন ও পেট্রলের ক্ষেত্রেও কোনো ঘাটতি নেই। বর্তমানে দেশে ২৯ হাজার ৪৮৪ টন অকটেন এবং ১৮ হাজার ৮৩০ টন পেট্রল মজুত আছে। গত মাসে তেলের সরবরাহ কিছুটা কমানো হলেও এখন আবার তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির মতে, সরকারের তেলের দাম বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত মূলত তাদের বাধ্যবাধকতার ফসল। এর ফলে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির মারাত্মক চাপ পড়বে। দাম বাড়ালেও তা জ্বালানি তেলের সহজলভ্যতা খুব বেশি বাড়াতে পারবে না বলে গবেষকরা মনে করেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ