ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চুরির হিড়িক: হাতেনাতে ধরা পড়লেন সুজন নামের এক যুবক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এখন যেন চোরদের অভয়ারণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে এসে প্রতিনিয়ত নিজেদের মোবাইল ফোন, নগদ টাকা বা প্রয়োজনীয় ব্যাগ হারাচ্ছেন। এই চুরির দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কয়েকদিন ধরেই সতর্ক অবস্থানে ছিল। অবশেষে গতকাল বিকেলে চুরির অভিযোগে সুজন নামের এক ব্যক্তিকে হাতেনাতে আটক করেছে স্থানীয় জনতা। আটককৃত সুজন কোটচাঁদপুর উপজেলার ১ নম্বর আলামপুর এলাকার বাসিন্দা। হাসপাতালের ভেতর থেকে রোগীদের মালামাল হাতানোর সময় তাকে ধরে ফেলা হয়।

হাসপাতালের প্রত্যক্ষদর্শী ও রোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সুজন দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতালের বহির্বিভাগ এবং জরুরি বিভাগের আশেপাশে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করছিলেন। তিনি মূলত এমন কাউকে খুঁজছিলেন যারা চিকিৎসা নিতে ব্যস্ত বা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। এক সময় সুযোগ বুঝে তিনি এক রোগীর বেডের পাশ থেকে একটি দামি স্মার্টফোন সরিয়ে নেন। কিন্তু ফোনটি পকেটে ঢোকানোর মুহূর্তেই ওই রোগীর স্বজন তাকে দেখে ফেলেন। সাথে সাথে শুরু হয় চিৎকার। আশপাশের লোকজন এসে সুজনকে ঘিরে ধরে এবং পালানোর পথ বন্ধ করে দেয়। এরপর সবাই মিলে তাকে আটক করে হাসপাতালের দায়িত্বরত কর্মীদের হাতে তুলে দেন।

তথ্য অনুযায়ী, কোটচাঁদপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৪০%। প্রতিদিন এখানে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এত মানুষের ভিড়ে কে রোগী আর কে চোর, তা চেনা দায়। হাসপাতালের কর্মচারীরা বলছেন, আটককৃত সুজনকে এর আগেও কয়েকবার হাসপাতালে অকারণে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে। উদ্ধারকৃত মোবাইল ফোনটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় $১৮০ ডলারের সমান হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সুজন প্রথমে চুরির কথা অস্বীকার করলেও উপস্থিত জনতার জেরার মুখে পরে সব স্বীকার করেন।

খবর পেয়ে কোটচাঁদপুর মডেল থানা পুলিশের একটি টহল দল দ্রুত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছায়। তারা সুজনকে হেফাজতে নিয়ে থানায় নিয়ে যায়। থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জানান, সুজনের বিরুদ্ধে এর আগেও এলাকায় ছোটখাটো চুরির ৫-৬টি মৌখিক অভিযোগ ছিল। তবে এবার তাকে অকাট্য প্রমাণসহ ধরা হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করে দেখছে যে, এই চুরির সাথে হাসপাতালের কোনো অসাধু কর্মচারী বা বাইরের কোনো বড় চক্র জড়িত কি না। পুলিশ বলছে, তারা এই চুরির রহস্য উদ্ঘাটনে ১০০% প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

হাসপাতালে আসা রোগীরা এখন বেশ আতঙ্কিত। অনেকেই বলছেন, সরকারি হাসপাতালে এসেও যদি জানমালের নিরাপত্তা না থাকে, তবে মানুষ কোথায় যাবে? গত মাসেও এখানে ৩টি মোবাইল ফোন এবং রোগীদের রাখা ৫০০০ টাকা চুরি হয়েছিল। ভুক্তভোগীদের দাবি, হাসপাতালের ভেতরে অন্তত ২০টি নতুন সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা প্রয়োজন। বর্তমানে মাত্র ৫০% এলাকায় ক্যামেরার নজরদারি রয়েছে, যা অপরাধ দমনে যথেষ্ট নয়। হাসপাতালের এই নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সাধারণ মানুষ।

আটক সুজনের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, সে বেশ কিছুদিন ধরে বেকার ছিল। তবে তার এই চুরির অভ্যাস সম্পর্কে তারা বিশেষ কিছু জানতেন না। আলামপুর এলাকার বাসিন্দারা সুজনের এমন কর্মকাণ্ডে লজ্জিত। তাদের মতে, মাদকের নেশায় জড়িয়েই আজকাল অনেক যুবক এই ধরনের ছোটখাটো চুরি থেকে শুরু করে বড় বড় অপরাধে জড়াচ্ছে। এলাকায় মাদকের বিস্তার ১০% থেকে ১৫% বেড়েছে বলে মনে করছেন অনেকে, যা অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন থেকে নিরাপত্তারক্ষীদের টহল আরও বাড়ানো হবে। বিশেষ করে রাতের বেলা বা দুপুরের নির্জন সময়ে যখন মানুষ বিশ্রাম নেয়, তখন নজরদারি আরও কঠোর করা হবে। রোগীদের বলা হয়েছে, তারা যেন তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র সম্পর্কে ১০০% সচেতন থাকেন। হাসপাতাল চত্বরে প্রবেশকারী বহিরাগতদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে আলাদা রেজিস্টার খাতা খোলার পরিকল্পনাও করছে কর্তৃপক্ষ। চোর সুজনের এই আটকের ঘটনায় অন্যান্য চোরদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বর্তমানে সুজন থানা হেফাজতে রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ আশ্বস্ত করেছে যে, এই এলাকাকে অপরাধমুক্ত করতে তারা নিয়মিত অভিযান চালাবে। এলাকাবাসী চান, এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হোক এবং হাসপাতাল যেন মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়। সাধারণ জনগণের এই ছোট ছোট জয়ই আসলে সমাজের অপরাধ দমনে বড় ভূমিকা রাখে। কোটচাঁদপুর থানার পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে চুরির তথ্য দিয়ে সহায়তা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ