চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নবাবগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আজ যেন আনন্দের মেলা বসেছিল। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রীদের জন্য বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয়েছিল এক জমকালো সংবর্ধনা ও মিষ্টিমুখ অনুষ্ঠান। মঙ্গলবার সকাল ১২টার দিকে যখন বিদ্যালয়ের আঙিনা শিক্ষার্থীদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে, তখন সবার চোখে-মুখে ছিল এক বিশাল প্রাপ্তির তৃপ্তি। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম আর ধৈর্য শেষে সাফল্যের সিঁড়িতে পা রাখা এই মেধাবী মেয়েদের আজ ফুল আর মিষ্টি দিয়ে বরণ করে নিলেন তাদের প্রিয় শিক্ষকরা।
এবারের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি তার গৌরবের ধারা বজায় রেখেছে। বিদ্যালয়টি থেকে এ বছর মোট ২২৩ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছে ২০৮ জন ছাত্রী। অর্থাৎ এই বিদ্যালয়ের পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৯৩.২৭ শতাংশ (%)। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন করেছে ৯২ জন শিক্ষার্থী। এই উচ্চ সাফল্যের হার প্রমাণ করে যে, প্রতিকূল পরিবেশেও এই বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা পড়াশোনায় কোনো ছাড় দেয়নি। তাদের এই অর্জনে অভিভাবক মহলও আজ বেশ সন্তুষ্ট।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মুহূর্ত ছিল যখন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোসাঃ রওশনয়ারা একে একে ছাত্রীদের মিষ্টিমুখ করাচ্ছিলেন। হাসিমুখে মিষ্টির প্যাকেট হাতে নিয়ে মেয়েরা তাদের শিক্ষকদের সাথে সেলফি তুলতে ব্যস্ত ছিল। আনন্দ কেবল পাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং আগামী দিনের বড় স্বপ্ন দেখার পথে এটি ছিল প্রথম ধাপ। অনেক ছাত্রী খুশিতে কেঁদেও ফেলেছিল। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ৯৩.২৭% পাসের এই হারকে আগামী বছর ১০০% এ উন্নীত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষকরা বিশ্বাস করেন, যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে তবে এই বিদ্যালয় জেলায় শ্রেষ্ঠত্বের স্থান ধরে রাখবে।
বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া পরিবারের জন্য বেশ ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের মতে, গত দুই বছরে শিক্ষা উপকরণের দাম অন্তত ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি মেয়ের এসএসসির প্রস্তুতির জন্য খাতা, কলম এবং গাইড বই বাবদ বছরে প্রায় ৪০০থেকে৬০০ডলার সমপরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয় অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারকে। এত খরচের ভিড়ে যখন এমন ভালো ফলাফল আসে, তখন পরিবারের সব কষ্ট সার্থক মনে হয়। অনুষ্ঠানে আসা কয়েকজন অভিভাবক জানান, তাদের মাসিক আয়ের বড় একটি অংশ খরচ হয় মেয়েদের শিক্ষার পেছনে, তাই সন্তানদের এই সাফল্য তাদের জন্য অনেক বড় পুরস্কার।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোসাঃ রওশনয়ারা তার বক্তব্যে সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব দিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে। তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের এই সাফল্য আমাদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের সার্থকতা। আমরা শুধু পাঠ্যবই পড়াই না, বরং ছাত্রীদের নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তোলার চেষ্টা করি। আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের দায়িত্বের প্রায় ৯৫% ই নিখুঁতভাবে পালন করেন বলেই আজ ৯২ জন ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছে।” তিনি আরও জানান যে, ভবিষ্যতেও বিদ্যালয়ের মান বজায় রাখতে এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ক্লাসরুমের ব্যবহার আরও বাড়ানো হবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ শিক্ষক মণ্ডলী। এদের মধ্যে সিনিয়র শিক্ষক মোঃ মাসুদ রানা, মোঃ শফিউল আজম, লিনস হাঁসদা এবং মোসাঃ শিরিন আকতার শিউলি ছাত্রীদের আগামী দিনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক কথা বলেন। সহকারী শিক্ষক মোঃ আব্দুল হান্নান, মাহবুব আলম, মোসাঃ হিরা খাতুন ও মোঃ জিয়াউর রহমানও তাদের সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন। শিক্ষকদের মতে, শিক্ষার্থীদের এই ৯০% এর ওপর পাসের হার বজায় রাখার পেছনে নিয়মিত ক্লাস টেস্ট এবং মক এক্সামের বড় ভূমিকা ছিল। তাদের এই ঐক্যবদ্ধ কাজের ফলেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় বিদ্যালয়ের নাম উজ্জ্বল হয়েছে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগামী দিনে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার ০% এ নামিয়ে আনার লক্ষ্য স্থির করেছে। তারা চায় প্রতিটি মেয়ে যেন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজের সম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠে। জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রীরাও তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলে যে, শিক্ষকরা আমাদের ছোট বোন বা মেয়ের মতো স্নেহ দিয়ে পড়িয়েছেন। কোনো কঠিন বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে তারা বারবার তা বুঝিয়ে দিতেন। স্কুলের এই পারিবারিক পরিবেশই তাদের ভালো ফলের মূল রহস্য। তারা ভবিষ্যতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা সুনাগরিক হয়ে দেশের সেবা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।
সব শেষে উৎসবের আমেজ যেন আরও গাঢ় হয় যখন ছাত্রীরা দলবেঁধে আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, এটি ছিল নতুন প্রজন্মের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর একটি মোক্ষম হাতিয়ার। নবাবগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এই সাফল্য পুরো জেলার অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য এক মহান প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। সাফল্যের এই ধারা অব্যাহত থাকুক এবং এই বিদ্যালয়ের মেয়েরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক এমনই প্রত্যাশা নিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। মিষ্টির মধুর আমেজ সাথে নিয়ে হাসিমুখে বাড়ির পথ ধরে ২০৮ জন সফল ছাত্রী।
















