বাঘারপাড়ার মাহমুদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এখন আনন্দের জোয়ার বইছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশ নিয়ে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে জমজ দুই বোন অঙ্কিতা বিশ্বাস ও অনুসূয়া বিশ্বাস। তারা দুজনেই জিপিএ-৫ (এ+) পেয়ে তাদের পরিবার এবং বিদ্যালয়ের নাম উজ্জ্বল করেছে। জন্ম থেকেই তারা একসাথে বড় হয়েছে, আর এখন সাফল্যের শিখরেও তারা একসাথেই পা রাখল। এই অসাধারণ ফলাফলের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে এলাকায় তাদের নিয়ে বেশ চর্চা হচ্ছে।
অঙ্কিতা ও অনুসূয়া যশোর সদর উপজেলার কৈখালী গ্রামের বাসিন্দা। তাদের বাবা অনুকুল চন্দ্র বিশ্বাস একজন সাধারণ কর্মজীবী এবং মা অঞ্জলী রাণী গৃহিণী। দুই বোনের পড়াশোনার প্রতি টান ছোটবেলা থেকেই ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা একে অপরের শুধু বোনই নয়, বরং পড়াশোনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী এবং সহযোগীও ছিল। অঙ্কিতা কোনো বিষয়ে পিছিয়ে পড়লে অনুসূয়া তাকে সাহায্য করত, আবার অনুসূয়া কোনো সমস্যায় পড়লে অঙ্কিতা তা সমাধান করে দিত।
পড়াশোনার এই দীর্ঘ পথচলায় তাদের পরিশ্রম ছিল শতভাগ। প্রতিদিন তারা নিয়ম করে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পড়াশোনা করত। তাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, ক্লাসে তাদের উপস্থিতির হার ছিল ৯৮% এরও বেশি। বিজ্ঞান বিভাগের কঠিন বিষয়গুলো তারা একে অপরের সাথে আলোচনা করে সহজ করে তুলত। তাদের এই পারস্পরিক সহযোগিতার ফলেই আজ এসএসসির মতো বড় পরীক্ষায় ১০০% সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। গ্রামীণ পরিবেশের নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাদের এই জেদ সবাইকে অবাক করে দিয়েছে।
আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও তাদের বাবা মেয়ের পড়াশোনার খরচে কোনো কমতি রাখেননি। অনুকুল বাবু জানান, বর্তমানে সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে দুই মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানো বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। তিনি মাসে যা আয় করেন, তা বর্তমান বাজারের হিসেবে হয়তো মাত্র ২০০
থেকে২৫০থেকে২৫০
ডলারের সমান। গত এক বছরে খাতা-কলম ও শিক্ষা উপকরণের দাম প্রায় ২০% বৃদ্ধি পেলেও তিনি মেয়েদের স্বপ্ন পূরণে পিছুপা হননি। আজ মেয়েদের জিপিএ-৫ পাওয়ার খবরে তার সব কষ্ট যেন নিমিষেই দূর হয়ে গেছে।
অঙ্কিতা ও অনুসূয়ার মা অঞ্জলী রাণী বলেন, আমার মেয়েরা রাত জেগে পড়াশোনা করত। একজন পড়তে বসলে অন্যজন ঘুমাতে চাইত না। তাদের মধ্যে এই যে একাগ্রতা, এটাই তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। পরীক্ষার দিনগুলোতে তারা খুব টেনশনে ছিল, কিন্তু আমি জানতাম তারা ভালো করবে। ফল প্রকাশের পর যখন জানলাম দুজনেই এ+ পেয়েছে, তখন খুশিতে চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। পাড়া-প্রতিবেশীরাও আমাদের মিষ্টি খাইয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছেন।
মাহমুদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাদের সাফল্যে গর্ব প্রকাশ করে বলেন, অঙ্কিতা ও অনুসূয়া শুধু মেধাবীই নয়, তারা অত্যন্ত বিনয়ী। বিদ্যালয়ের প্রতিটি পরীক্ষায় তারা তাদের মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। গ্রামের স্কুল থেকে একসাথে দুই বোনের এমন ফলাফল অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য বড় একটি অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। আমরা চাই তারা আরও বড় হোক এবং ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করুক। তাদের এই ফলাফল আমাদের বিদ্যালয়ের সাফল্যের হারকেও অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে কৈখালী গ্রামের প্রতিটি মানুষের মুখে এখন এই জমজ বোনের নাম। স্থানীয়রা বলছেন, যেখানে অনেক মেয়ে মাঝপথেই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, সেখানে এই দুই বোন প্রতিকূলতা জয় করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের এই সাফল্য শুধু তাদের পরিবারের নয়, বরং পুরো বাঘারপাড়া উপজেলার গর্ব। গ্রামের অনেক অভিভাবক এখন তাদের সন্তানদের উদাহরণ হিসেবে অঙ্কিতা ও অনুসূয়ার কথা বলছেন। সাধারণ মানুষের এই ভালোবাসা ও প্রশংসা দুই বোনকে ভবিষ্যতে আরও ভালো করার প্রেরণা দিচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অঙ্কিতা ও অনুসূয়া জানায়, তারা দুজনেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভালো পেশায় নিয়োজিত হতে চায়। তারা বড় হয়ে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, যাতে দেশের সাধারণ মানুষের সেবা করতে পারে। তারা মনে করে, ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে যেকোনো বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। দুই বোন ভবিষ্যতে একই কলেজে পড়াশোনা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তাদের এই অটুট বন্ধন আর সাফল্যের ধারা যেন সারা জীবন বজায় থাকে, এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।
















