চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলায় মাদকের বিষ রুখতে কঠোর অবস্থানে নেমেছে পুলিশ। জেলাজুড়ে মাদকের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, তারই অংশ হিসেবে গতকাল এক ঝটিকা অভিযান চালায় নাচোল থানা পুলিশ। এই অভিযানে গাঁজাসহ এক ব্যক্তিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে তারা এখন ১০০% সতর্ক। গ্রামগঞ্জে মাদকের ছোট ছোট ডেরাগুলো গুঁড়িয়ে দিতে এই ধরনের তল্লাশি এখন নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের এই তৎপরতায় এলাকায় স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
জেলা পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাসের কড়া নির্দেশনায় পুরো জেলায় মাদকবিরোধী চিরুনি অভিযান চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় নাচোলের কসবা ইউনিয়নের চন্দ্রাইল গ্রামে ওত পাতে পুলিশের একটি চৌকস দল। এসআই মো. দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে এই বিশেষ অভিযানটি পরিচালিত হয়। গোপন সূত্রে পুলিশ খবর পায় যে, ওই এলাকায় জনৈক এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে গোপনে মাদক কেনাবেচা করে আসছিলেন। খবর পাওয়ামাত্রই পুলিশ কালক্ষেপণ না করে ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থান নেয় এবং পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে।
অভিযানের এক পর্যায়ে চন্দ্রাইল গ্রামের মৃত জালাল উদ্দীনের ছেলে মো. আলতাব আলীকে (৫৩) তার নিজের বসতবাড়ির সামনেই চ্যালেঞ্জ করে পুলিশ। পালানোর কোনো সুযোগ না দিয়ে পুলিশ তাকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর তল্লাশি চালিয়ে তার কাছ থেকে ছোট ছোট ২৫টি পুরিয়ায় রাখা মোট ৫০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়। খুচরা মাদক বিক্রেতারা এই ধরনের ছোট ছোট প্যাকেটে মাদক ভরে তরুণদের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ মনে করছে, ছোট এই চালানের পেছনে কোনো বড় চক্রের হাত থাকতে পারে কি না তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান সময়ে দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে মাদকের অনুপ্রবেশ বেড়ে যাওয়ায় অপরাধ প্রবণতাও অনেক বেড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৮০% অপরাধের সাথে কোনো না কোনোভাবে মাদকের সংশ্লিষ্টতা থাকে। আলতাব আলীর মতো মাদক কারবারিরা মূলত ছোট ছোট বিক্রির মাধ্যমেই পুরো গ্রামকে নেশার জালে আচ্ছন্ন করে ফেলে। মাদক বিক্রির এই টাকা সমাজকে কলুষিত করছে এবং শত শত $ ডলারের সমপরিমাণ দেশীয় অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে মাদকের অন্ধকার জগতে। পুলিশ এখন এই বিষাক্ত চেইনটি ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর।
গ্রেপ্তার হওয়া আলতাব আলীর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই নাচোল থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে মাদক কেনাবেচার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। পুলিশ যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। স্থানীয়রা পুলিশের এই তৎপরতাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, যদি প্রতিদিন এভাবে অন্তত একটি করে সফল অভিযান চালানো হয়, তবে এলাকার মাদক ব্যবসায়ীরা ৯০% কমে যাবে।
নাচোল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকোমল চন্দ্র দেবনাথ এই অভিযানের বিষয়ে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, মাদকমুক্ত সমাজ গড়া তাদের প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, “আমরা মাদকের ব্যাপারে শূন্য সহনশীলতা বা জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলছি। মাদক ব্যবসায়ী যে-ই হোক, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আমাদের এই অভিযান আগামী দিনগুলোতে আরও কঠোর হবে।” তিনি স্থানীয় জনগণের প্রতিও আহ্বান জানান যেন কেউ মাদকের কোনো খবর পেলে সাথে সাথে পুলিশকে ১০০% গোপনীয়তার সাথে অবহিত করে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী ইউনিয়নগুলোতে পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারি এখন আগের চেয়ে অনেক গুণ বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে নাচোলের মতো কৃষিপ্রধান এলাকায় মাদক ছড়িয়ে পড়া মানেই ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হওয়া। পুলিশের এই ৫০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার হয়তো শুনতে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু এটি একটি বৃহত্তর মাদক নেটওয়ার্কের অংশ হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিজিবি ও পুলিশ যদি এভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে, তবে এই জেলা থেকে মাদক চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব হবে।
পরিশেষে বলা যায়, মাদকের হাত থেকে সমাজকে বাঁচাতে হলে সম্মিলিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি পরিবারকে তাদের সন্তানদের প্রতি ১০০% সজাগ থাকতে হবে। আলতাব আলীর মতো অপরাধীদের গ্রেপ্তার করার মাধ্যমে পুলিশ সমাজের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার প্রমাণ দিচ্ছে। নাচোলের এই সফল অভিযান ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো চক্রের হদিস দেবে বলে স্থানীয় সচেতন মহল আশা প্রকাশ করছে। সমাজ থেকে মাদক পুরোপুরি দূর করতে পুলিশের এই আপোষহীন লড়াই অব্যাহত থাকবে এটাই সাধারণ মানুষের বড় প্রত্যাশা।
















