রায়পুরায় আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান চাঁন মিয়া গ্রেপ্তার: এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সাদ্দাম উদ্দীন রাজ, নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি:

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় এক ঝটিকা অভিযানে প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগ নেতা ফরহাদ হোসেন চাঁন মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তিনি উপজেলার মহেশপুর ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান এবং একইসাথে রায়পুরা উপজেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন। শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬ তারিখ রাত ১০টার দিকে মহেশপুর ইউনিয়নের ঝাউকান্দি এলাকা থেকে পুলিশ তাকে আটক করে। এই গ্রেপ্তারের ঘটনায় পুরো রায়পুরা এলাকায় বর্তমানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

পুলিশের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, আগে থেকেই চাঁন মিয়ার গতিবিধির ওপর নজর রাখছিল গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। শনিবার রাতে তিনি যখন ঝাউকান্দি এলাকায় তার কিছু অনুসারীদের নিয়ে অবস্থান করছিলেন, ঠিক তখনই পুলিশি বেষ্টনী তৈরি করা হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর চেষ্টা করলেও ১০০% সফল হতে পারেননি এই প্রভাবশালী নেতা। রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবুর রহমানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই বিশেষ অভিযানটি পরিচালিত হয়। কোনো প্রকার রক্তপাত বা বিশৃঙ্খলা ছাড়াই পুলিশ তাকে হ্যান্ডকাফ পরাতে সক্ষম হয়।

আটকের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে রায়পুরা থানার ওসি মজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, ফরহাদ হোসেন চাঁন মিয়ার বিরুদ্ধে আগে থেকেই একটি মামলা আদালতে বিচারাধীন ছিল। সেই মামলায় বিজ্ঞ আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা ‘ওয়ারেন্ট’ জারি করেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পলাতক না থাকলেও পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার চেষ্টা করছিলেন। আজ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা নিশ্চিত হই যে তিনি ঝাউকান্দি এলাকায় আছেন, এবং সাথে সাথেই অভিযান চালিয়ে তাকে আইনের আওতায় আনা হয়। পুলিশ জানায়, আইনের চোখে সবাই সমান এবং আদালতের পরোয়ানা তামিল করা তাদের রুটিন দায়িত্ব।

চাঁন মিয়ার গ্রেপ্তারের খবর মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ঝাউকান্দি ও মহেশপুর এলাকায় তার অনেক সমর্থক থাকলেও পুলিশের কড়া অবস্থানের কারণে কেউ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিবাদ মিছিল বের করতে সাহস পায়নি। স্থানীয় বাজারে চায়ের টেবিলে এখন একটাই আলোচনা—চাঁন মিয়ার মতো ক্ষমতাধর মানুষের পতন কীভাবে হলো। এলাকার সাধারণ মানুষের দাবি, রায়পুরায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হবে। পুলিশ প্রশাসনের এই সাহসী পদক্ষেপকে ৮০% মানুষ স্বাগত জানালেও রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।

গ্রেপ্তারের পর চাঁন মিয়াকে কড়া পাহারায় রায়পুরা থানায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে হাজতখানায় রাখা হয়েছে। ওসি মজিবুর রহমান আরও নিশ্চিত করেছেন যে, আইনি সব প্রক্রিয়া শেষ করে আগামীকাল অর্থাৎ ২ আগস্ট তাকে নরসিংদী জেলা আদালতে সোপর্দ করা হবে। তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো নাশকতা বা দুর্নীতির অভিযোগ আছে কি না, তাও পুলিশ খতিয়ে দেখছে। বর্তমানে রায়পুরা থানায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং ৫-১০ জন অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যকে থানার প্রধান ফটকে পাহারায় রাখা হয়েছে।

রায়পুরার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়কের এই গ্রেপ্তার স্থানীয় রাজনীতিতে বড় ধরণের প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে সামনে ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তার অনুপস্থিতি বড় ধরণের শূন্যতা তৈরি করতে পারে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ নিয়ে কেউ যদি আইন লঙ্ঘন করে বা আদালতের আদেশ অমান্য করে, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ পিছপা হবে না। বর্তমান সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, এই গ্রেপ্তার তারই একটি অংশ বলে অনেকে মনে করছেন।

পরিশেষে বলা যায়, ফরহাদ হোসেন চাঁন মিয়ার গ্রেপ্তার রায়পুরার সাধারণ মানুষের মনে পুলিশের প্রতি আস্থা বাড়িয়ে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন তৎপরতা অব্যাহত থাকলে এলাকায় অপরাধের মাত্রা ৫% এর নিচে নেমে আসবে বলে সচেতন মহল মনে করে। আপাতত সবার নজর এখন আদালতের দিকে, সেখানে বিচারক কী সিদ্ধান্ত দেন তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে নরসিংদীবাসী। পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মহেশপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে নিয়মিত টহল অব্যাহত থাকবে যাতে কোনো কুচক্রী মহল এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে দাঙ্গা না বাধাতে পারে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ