মাহিদুল ইসলাম ফরহাদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সীমান্ত এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে ৫৩ বিজিবি। ১ আগস্ট ২০২৬ তারিখ রাত ১টার দিকে শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়নের গাইপাড়া গ্রাম থেকে ৯৬ বোতল ভারতীয় নেশাজাতীয় এস্কাফ সিরাপ উদ্ধার করা হয়েছে। ফতেপুর বিওপির একটি চৌকস টহল দল এই বিশেষ অভিযানটি পরিচালনা করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানো এই অভিযানে মাদক পাচারকারীরা মালামাল ফেলে পালিয়ে গেলেও বিজিবি সদস্যরা অবৈধ মাদকগুলো জব্দ করতে সক্ষম হন। বিজিবির এই অতর্কিত অভিযানে মাদক কারবারিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বিজিবি সূত্র থেকে জানা গেছে, গভীর রাতে সীমান্ত দিয়ে মাদকের একটি বড় চালান আসার খবর পায় বিজিবি। খবর পাওয়ার সাথে সাথে ফতেপুর বিওপির জোয়ানরা নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান নেন। অন্ধকারে ছায়া দেখে পাচারকারীদের থামার সংকেত দিলে তারা দুটি প্লাস্টিকের ব্যাগ ফেলে দ্রুত ঘন ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে বিজিবি সদস্যরা ব্যাগগুলো তল্লাশি করে ৯৬ বোতল নিষিদ্ধ ভারতীয় এস্কাফ সিরাপ উদ্ধার করেন। জব্দ করা এই মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩৮,৪০০/- টাকা। উদ্ধারকৃত এই মাদকদ্রব্যগুলো পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে শিবগঞ্জ থানায় জমা দেওয়া হয়েছে।
বিজিবির তথ্যমতে, শুধু এই একটি অভিযান নয় বরং গত জুলাই মাস জুড়ে ৫৩ বিজিবি সীমান্তে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছে। গত মাসে তাদের বিভিন্ন অভিযানে মোট ৬৯৯ বোতল এস্কাফ সিরাপ, ৬৪ বোতল ফেয়ারডিল এবং ৯০ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়। এসব অভিযানে একজন মাদক কারবারিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। জুলাই মাসে জব্দ করা এসব মাদকের মোট বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪,৪০,২০০/- টাকা। বিজিবির এমন ধারাবাহিক সাফল্যে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান অনেকাংশে কমে এসেছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
সীমান্ত এলাকায় বর্তমান সময়ে মাদকের চাহিদা বাড়তে থাকায় পাচারকারীরা নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। তবে ৫৩ বিজিবি তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ নস্যাৎ করে দিতে বদ্ধপরিকর। এস্কাফ সিরাপ বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে এক ভয়ংকর নেশা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এটি মূলত কাশি নিরাময়ের সিরাপ হলেও মাদকাসক্তরা এটি নেশার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে। সীমান্ত দিয়ে যাতে এ ধরণের কোনো ক্ষতিকর দ্রব্য দেশে ঢুকতে না পারে, সে ব্যাপারে ১০০% কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিজিবি প্রশাসন।
৫৩ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান, পিএসসি এই অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি সংবাদ মাধ্যমকে জানান, মাদকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে তারা বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নন। তিনি আরও বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য হলো সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো মূল্যে অবৈধ চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ বন্ধ করা। বিজিবির জোয়ানরা রোদ-বৃষ্টি কিংবা রাতের অন্ধকার উপেক্ষা করে সীমান্তে নিরলসভাবে পাহারা দিয়ে যাচ্ছেন।
মাদক পাচার রোধে স্থানীয় সাধারণ জনগণের সহযোগিতাও কামনা করেছে বিজিবি। তারা মনে করেন, কেবল বাহিনীর শক্তিতে সব অপরাধ দমন করা কঠিন, যদি না সাধারণ মানুষ সঠিক সময়ে তথ্য দিয়ে সাহায্য করে। শিবগঞ্জ সীমান্তের মানুষের মাঝে বিজিবির এই নিয়মিত অভিযান স্বস্তি এনে দিয়েছে। এলাকার সচেতন অভিভাবকরা মনে করছেন, বিজিবির এই কঠোর অবস্থান বজায় থাকলে তাদের সন্তানরা মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে রক্ষা পাবে এবং সীমান্তে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি বন্ধ হবে।
বর্তমান সময়ে সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি আগের চেয়ে কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বিট পুলিশিং ও জনসচেতনতামূলক কাজও চলছে। পাচারকারীরা মূলত ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে এসব মাদক বহন করে থাকে। তবে বিজিবির বিশেষ টহল দল সবসময় তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। আজকের এই ৯৬ বোতলের চালান ধরা পড়া বিজিবির সেই তীক্ষ্ণ নজরদারিরই এক বড় প্রমাণ। পাচারকারীরা ধরা না পড়লেও তাদের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করার কাজ চলছে।
আগামী দিনগুলোতেও এ ধরণের ঝটিকা অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে বিজিবি সূত্রে জানানো হয়েছে। অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই আইনের ফাঁক দিয়ে পার না পায়, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে আইনি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হচ্ছে। জব্দকৃত প্রতিটি মাদকদ্রব্য নিয়ম অনুযায়ী ধ্বংস করা বা সংশ্লিষ্ট থানায় সোপর্দ করার প্রক্রিয়া নিয়মিত চলছে। বিজিবির এই অনমনীয় অবস্থান সীমান্ত এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
















