ইউএনও’র দপ্তরে গিয়ে এমপির সংবর্ধনা: কুষ্টিয়ায় প্রটোকল নিয়ে বিতর্কের ঝড়

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়াঃ

কুষ্টিয়ার মিরপুরে এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে যা নিয়ে পুরো জেলাজুড়ে এখন তোলপাড় চলছে। সাধারণত সরকারি কর্মকর্তারা স্থানীয় সংসদ সদস্যদের প্রটোকল দিয়ে থাকেন কিংবা তাঁদের সম্মান জানান। কিন্তু এবার দেখা গেল একদম উল্টো চিত্র। নবনিযুক্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজ শাহীন খসরুকে তাঁর নিজের অফিস কক্ষে গিয়ে ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুল গফুর। মঙ্গলবার সকালে এই ঘটনাটি ঘটার পর সংসদ সদস্য নিজেই তাঁর ফেসবুক পেজে ৩টি ছবিসহ একটি পোস্ট দেন। এরপরই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। নেটিজেনদের বড় একটি অংশ রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা ক্রম বা ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’ লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

আবদুল গফুর কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনের সংসদ সদস্য এবং তিনি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সাথে যুক্ত। মঙ্গলবার সকাল ১০টা ১৬ মিনিটে তিনি তাঁর ফেসবুক পোস্টে জানান যে, মিরপুর উপজেলাবাসীর পক্ষ থেকে তিনি নতুন ইউএনওকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। ছবিতে দেখা যায়, সংসদ সদস্যের সাথে জামায়াতে ইসলামীর বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা-কর্মীও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী অধ্যাপক জোমারত আলী, পৌর মেয়র পদপ্রার্থী রেজাউল করিম এবং ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মওলানা ওমর ফারুক। সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে ইউএনওকে ফুলের তোড়ার পাশাপাশি একটি বইও উপহার দেওয়া হয়। সংসদ সদস্য তাঁর পোস্টে প্রশাসনের সাথে মিলেমিশে জনকল্যাণে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

ফেসবুক পোস্টের নিচে মন্তব্যের ঘরে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একজন সচেতন নাগরিক লিখেছেন, “এমপি কি ইউএনওকে বরণ করবেন, নাকি ইউএনও এমপিকে বরণ করবেন? প্রটোকল সম্পর্কে কি আমাদের ধারণা একদম ০% হয়ে গেছে?” আরেকজন মন্তব্য করেছেন যে, এভাবে দলবল নিয়ে ইউএনওর কক্ষে গিয়ে ফুল দেওয়াটা প্রশাসনের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সাধারণত কোনো সরকারি কর্মকর্তা নতুন কর্মস্থলে যোগ দিলে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা দেখা করতে পারেন, কিন্তু এভাবে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা দেওয়ার বিষয়টি অনেকেই স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছেন না। প্রায় ১০০-র বেশি নেতিবাচক কমেন্টে মানুষ এই নিয়ে নানা যুক্তি দেখাচ্ছেন। অনেকে মনে করছেন, এটি প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের একটি কৌশল মাত্র।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) মনে করে, এই ধরনের ঘটনা সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে। সনাক সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, যখন একজন ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেতা তাঁর অনুসারীদের নিয়ে কোনো কর্মকর্তার কক্ষে ঢোকেন, তখন সেখানে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এটি ১০% সৌজন্য হলেও এর আড়ালে ৯০% রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা থাকে বলে অনেকে মনে করেন। জনগণের কাছে বার্তা যায় যে, প্রশাসন হয়তো কোনো নির্দিষ্ট দলের অনুগত হয়ে কাজ করবে। এতে সাধারণ মানুষের মনে সরকারি সেবার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় তৈরি হতে পারে। নিয়ম অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তার যোগদান উপলক্ষে সংসদ সদস্যের নিজ দপ্তরে যাওয়ার রীতি নেই বললেই চলে।

এ বিষয়ে নবনিযুক্ত ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরু জানান, তিনি সম্প্রতি যোগ দিয়েছেন এবং সংসদ সদস্য মূলত সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, “এমপি স্যারের পিএস আমাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে স্যার দেখা করতে আসবেন। যেহেতু আমরা একসাথে এলাকার উন্নয়নের কাজ করব, তাই তিনি নিজ থেকেই ফুল ও উপহার নিয়ে এসেছেন।” প্রটোকল নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, জনপ্রতিনিধিদের সাথে এই সুসম্পর্ক ভবিষ্যতে প্রশাসনিক কাজে সমন্বয় করতে সহায়তা করবে। তিনি আরও জানান যে, এর কয়েক দিন আগে জামায়াতের নেতা-কর্মীরাও একবার এসে তাঁকে আলাদাভাবে শুভেচ্ছা জানিয়ে গেছেন।

বাংলাদেশে এই ধরনের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী পটিয়া থানায় মিষ্টি ও ফুল নিয়ে ওসির কাছে গিয়েছিলেন। সে সময়ও বিষয়টি নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। বিশ্লেষকরা মনে করেন, জনপ্রতিনিধিদের উচিত প্রশাসনের সাথে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করা, যাতে আইনি বা দাপ্তরিক প্রক্রিয়ায় কোনো পক্ষপাতিত্ব না ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতারা ৫% থেকে ১০% সৌজন্যের দোহাই দিয়ে প্রশাসনের বড় কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব খাটাতে চান, যা সুশাসনের জন্য হুমকিস্বরূপ।

রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের অবস্থান অনেক উপরে। সেখানে একজন এমপির তাঁর চেয়ে নিচের পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার ডেস্কে গিয়ে ফুল দেওয়াটা প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য বিব্রতকর হতে পারে। মিরপুরের সাধারণ মানুষের দাবি, এই ধরনের পাল্টাপাল্টি বরণ অনুষ্ঠান বন্ধ হওয়া উচিত। তারা চায় প্রশাসন যেন কোনো দলের বা নেতার প্রভাবে না পড়ে ১০০% স্বচ্ছতার সাথে কাজ করে। কুষ্টিয়ার এই ঘটনাটি এখন কেবল একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়ে বড় একটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সংসদ সদস্য আবদুল গফুরের সাথে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

সম্পর্কিত নিবন্ধ