ইরানকে তথ্য দিচ্ছে মার্কিন সেনাদের মোবাইল! মধ্যপ্রাচ্যে ফোন ব্যবহারে পেন্টাগনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন হাজার হাজার মার্কিন সেনার জন্য এক দুঃসংবাদ নিয়ে এল পেন্টাগন। তাদের হাতের স্মার্টফোনটি এখন আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং নিজের ও সহকর্মীদের জীবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, সেনাদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ছবি ও ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে তা ইরানকে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার নির্ভুল নিশানা ঠিক করতে সহায়তা করছে। এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে রয়টার্স জানিয়েছে, জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সেনাদের স্মার্টফোন অচিরেই জমা নিয়ে নেওয়া হতে পারে।

অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার গত ২৮ জুলাই লেখা এক গোপন চিঠিতে সেনাদের অপারেশনাল নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক করেন। রয়টার্সের হাতে আসা ওই চিঠিতে দেখা যায়, কুপার অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে জানিয়েছেন যে, ইরান বা তাদের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো যখন হামলা চালায়, তখন মার্কিন সেনারা অনেক সময় উত্তেজনার বসে সেই দৃশ্য ভিডিও করেন। এরপর সেই ভিডিও বা ছবি যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা হয়, তখন ইরান ঘরে বসেই বুঝতে পারে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ঠিক কোথায় আঘাত হেনেছে। এতে ইরান বুঝতে পারে তাদের হামলা কতটা সফল হয়েছে এবং পরবর্তী হামলার জন্য তারা তাদের পাল্লা বা লক্ষ্যবস্তু ১০০% নিখুঁতভাবে সমন্বয় করার সুযোগ পায়।

কুপারের এই চিঠিতে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার উল্লেখ আছে। সম্প্রতি জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানের এক প্রাণঘাতী হামলার সময় এক মার্কিন সেনা তাঁর ‘মেটা স্মার্ট গ্লাস’ (ফেসবুকের বিশেষ চশমা) দিয়ে ভিডিও ধারণ করেন। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় সেনারা কীভাবে দৌড়ে বাংকারে আশ্রয় নিচ্ছেন। এই ভিডিওটি পরবর্তীতে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা হলে তা সরাসরি ইরানের গোয়েন্দাদের হাতে পৌঁছে যায়। কুপার লেখেন, “ইরান হয়তো জানে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, কিন্তু সেটি লক্ষ্যবস্তু থেকে ৫০ মিটার দূরে পড়েছে নাকি কোনো জনাকীর্ণ ব্যারাকে আঘাত করেছে—তা তারা জানত না। কিন্তু আমাদের সেনাদের ভিডিওর কারণে তারা বিনা মূল্যে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের সুযোগ পাচ্ছে।”

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০,০০০ (চল্লিশ হাজার) মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে জর্ডানে রয়েছে প্রায় ৪,০০০ সেনা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৬০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। এই বিপুল হতাহতের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি ৩ জন মার্কিন নাগরিকের মধ্যে মাত্র ১ জন (অর্থাৎ প্রায় ৩৩%) এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীর ভেতরে তথ্য পাচার বন্ধ করা পেন্টাগনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মার্কিন সেনাদের মোবাইল ফোন জব্দ করার এই খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সেনাসদস্যদের পরিবারের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেক সেনাই তাঁদের স্বজনদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে ফোনের ওপর নির্ভরশীল। এখন যদি ফোন জমা দিয়ে দিতে হয়, তবে তাঁদের মানসিক অবস্থা আরও ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে পেন্টাগন মনে করছে, জীবনের ঝুঁকি এড়াতে এই পদক্ষেপ জরুরি। কারণ অনেক সময় ফিটনেস অ্যাপ বা ম্যাপের মাধ্যমে সেনাসদস্যদের অবস্থানসংক্রান্ত ডাটা প্রায় ৯০% নিখুঁতভাবে পাচার হয়ে যায়, যা ইরানকে হামলার ছক আঁকতে সাহায্য করে।

এদিকে, এই যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারাও সোচ্চার হয়েছেন। তাঁরা কেবল সেনাদের তথ্যই নয়, বরং মার্কিন বাহিনীর হামলায় সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। সম্প্রতি সিএনএনের এক তদন্তে উঠে এসেছে যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের হরমোজগান প্রদেশে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ১৫৬ জন নিহত হয়েছিলেন। যার মধ্যে ১২০ জনই ছিল কোমলমতি শিশু। এই ধরনের হৃদয়বিদারক ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যুদ্ধবিরোধী জনমত আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

সবশেষে বলা যায়, আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে স্মার্টফোন এখন যুদ্ধের ময়দানে দ্বিমুখী তলোয়ারের মতো কাজ করছে। পেন্টাগন এখন তথ্য নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে যাতে ইরান আর কোনো ‘ফ্রি’ গোয়েন্দা তথ্য না পায়। অ্যাডমিরাল কুপার স্পষ্ট করে বলেছেন, সেনাসদস্যরা যদি সচেতন না হন, তবে তাঁদের একটি ছোট ভিডিওই হতে পারে দ্বিতীয় দফার আরও ভয়াবহ হামলার ‘সবুজ সংকেত’। তাই আগামী কয়েক দিনের মধ্যে জর্ডান ও সিরিয়ার সীমান্ত এলাকায় থাকা মার্কিন সেনাদের মোবাইল ফোনগুলো লকার বা নির্দিষ্ট স্থানে জমা রাখা বাধ্যতামূলক হতে যাচ্ছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ