হবিগঞ্জে এনসিপির গাড়িবহরে হামলা: প্রতিবাদে আজ সারা দেশে বিক্ষোভের ডাক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। মঙ্গলবার বিকেলে দলটির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি চলাকালে এই হামলার ঘটনা ঘটে। এই হামলার প্রতিবাদে এবং দোষীদের গ্রেফতারের দাবিতে বুধবার সারা দেশে একযোগে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে এনসিপি। মঙ্গলবার রাতে দলের ফেসবুক পেজে এক জরুরি সাংগঠনিক নির্দেশনার মাধ্যমে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এই ঘটনায় দলের অন্যতম মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ অন্তত ২০ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হবিগঞ্জ টাউন হলের সামনে এনসিপির পূর্বনির্ধারিত সমাবেশ শেষ করে কেন্দ্রীয় নেতারা যখন সার্কিট হাউসের দিকে যাচ্ছিলেন, তখনই অতর্কিত হামলা চালানো হয়। স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় প্রথমে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া হয়। হামলাকারীরা অত্যন্ত সুসংগঠিত ছিল এবং তাদের হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। চালক সাহসিকতার সঙ্গে গাড়ি চালিয়ে দ্রুত সার্কিট হাউসে পৌঁছে গেলেও পেছনের গাড়িগুলো বিপদে পড়ে।

পেছনে থাকা সারজিস আলমের গাড়িটি হামলার মুখে পড়লে চালক জীবন বাঁচাতে শহরের সোনালী ব্যাংক ভবনের ভেতরে গাড়িটি ঢুকিয়ে দেন। সেখানে প্রায় ৩ ঘণ্টা সারজিস আলমকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। উত্তেজিত একদল যুবক ব্যাংক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকে এবং জানালার কাঁচ লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে থাকে। একপর্যায়ে পুলিশ ও র‍্যাবের বিশাল একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং রাত ৮টার দিকে সারজিস আলমকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। এনসিপির দাবি, পুলিশের ১০০% উপস্থিতিতেই এই হামলা হয়েছে, কিন্তু তারা আক্রমণকারীদের ঠেকাতে কার্যকর কোনো ভূমিকা নেয়নি।

এই হামলায় দলটির মিডিয়া টিমের একটি মাইক্রোবাস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এনসিপি নেতাদের দাবি অনুযায়ী, গাড়িটি মেরামত করতে অন্তত ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হবে। এছাড়া হামলাকারীরা সাংবাদিকদের মূল্যবান ক্যামেরা এবং দামী আইফোন ছিনিয়ে নিয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩০০০ ডলার ($) থেকে ৪০০০ ডলারের বেশি। হামলায় আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আহতদের মধ্যে অন্তত ১০% নেতা-কর্মীর হাত বা পা ভেঙে গেছে। এই ঘটনার জন্য এনসিপি সরাসরি স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের ক্যাডারদের দায়ী করেছে।

হামলার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে যারা হামলা চালিয়েছে, তারা গণতন্ত্রের শত্রু। ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা রামদা, হকিস্টিক ও চেইন নিয়ে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।” অন্যদিকে, হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, এনসিপি নেতারা তাদের সমাবেশে অত্যন্ত উসকানিমূলক ও আপত্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন। সেই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং এর ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তিনি একে পূর্বপরিকল্পিত হামলা বলতে নারাজ।

মঙ্গলবার রাতের জরুরি নির্দেশনায় এনসিপি তাদের সব মহানগর, জেলা এবং উপজেলা কমিটিকে রাজপথে নামার নির্দেশ দিয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বুধবারের কর্মসূচিতে দলীয় নেতা-কর্মীদের অন্তত ৯০% উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রকার উসকানির মুখে না পড়ে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর কথা বলা হলেও, হামলা হলে পাল্টা প্রতিরোধের ইঙ্গিতও দিয়েছে দলটি। এদিকে হবিগঞ্জ শহরে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। শহরের প্রধান প্রধান মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘ দিন পর হবিগঞ্জে এ ধরনের রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ঘটল। এতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর শহরের প্রায় ৭০% দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এনসিপি এবং বিএনপির এই সংঘাত আগামী দিনে দেশের রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশ প্রশাসন কোনো পক্ষকেই ছাড় দিতে চাচ্ছে না। অভিযুক্তদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ