৮০ বছর বয়স জীবনের এই পড়ন্ত বিকেলে এসে মানুষ চায় একটু শান্তি, যত্ন আর দুই বেলা পেট ভরে ভাত। কিন্তু ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার বিমলা রানীর ভাগ্যে জুটল কেবল অবহেলা আর হাড়ভাঙা কষ্ট। স্বামীর মৃত্যুর পর ভিটেমাটি থেকে বিতাড়িত হয়ে এখন তিনি বাস করছেন জনশূন্য এক পুকুরপাড়ে। জরাজীর্ণ একটি কুঁড়েঘরে কোনোমতে রাত কাটছে এই অসহায় বৃদ্ধার। সন্তানহীন এই বৃদ্ধা দীর্ঘ সময় ধরে রামদেবপুর গ্রামে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
ঘটনাটি পীরগঞ্জের ২নং কোষারাণীগঞ্জ ইউনিয়নের রামদেবপুর গ্রামের। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিমলা রানীর মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই হলো ভাঙা টিন আর বেড়া দিয়ে তৈরি এক চিলতে জরাজীর্ণ ঘর। ঘরের চালের ছিদ্র দিয়ে সামান্য বৃষ্টি হলেই ভেতরে পানি পড়ে। মেঝেতে নেই কোনো বিছানা বা তোশক। একটি পুরোনো ছেঁড়া বস্তা আর কিছু জীর্ণ কাপড়ের ওপর শুয়েই নির্ঘুম রাত কাটে তাঁর। শীত হোক বা বর্ষা এই নড়বড়ে কুঁড়েঘরটিই এখন তাঁর ৮০ বছরের জীবনের শেষ অবলম্বন।
বার্ধক্য এই বৃদ্ধাকে এখন পুরোপুরি কাবু করে ফেলেছে। তাঁর চোখের দৃষ্টি এখন ১০০% ঝাপসা হয়ে গেছে। কোমরের তীব্র ব্যথায় তিনি আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না, এমনকি একা চলাফেরা করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন। আগে হয়তো মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে ১০-২০ টাকা বা এক মুঠো চাল চেয়ে এনে কোনোমতে পেটের ক্ষুধা মেটাতেন, কিন্তু এখন শরীর সায় না দেওয়ায় মানুষের কাছে যাওয়ার পথও বন্ধ হয়ে গেছে। খাবারের অভাবে দিনের পর দিন তাঁকে আধপেটা বা না খেয়ে কাটাতে হচ্ছে।
বিমলা রানীর জীবনের গল্পটা অত্যন্ত নির্মম। তাঁর কোনো সন্তান নেই। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি তাঁর ন্যায্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, নিঃসন্তান হওয়ার অযুহাতে প্রভাবশালীরা তাঁর স্বামীর ভিটেমাটি দখল করে নিয়েছে, যার ফলে ঘরছাড়া হয়ে তিনি এই নির্জন পুকুরপাড়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। স্বামীর সম্পদ থাকলেও তাঁর কপালে জোটেনি এক ইঞ্চি জায়গা। ভিটেমাটি হারিয়ে তিনি এখন একা পুকুরপাড়ে মৃত্যু প্রহর গুনছেন।
নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন বিমলা রানী। তিনি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলেন, ‘স্বামীটা মরার পর আমার দিকে আর কেউ ফিরেও তাকালো না। আগে মানুষের কাছ থেকে হাত পেতে যা পেতাম, তা দিয়েই কোনোমতে খেয়ে বেঁচে থাকতাম। এখন তো বিছানা থেকে উঠতেই পারি না, খাব কী? আমার চিকিৎসার জন্য হাত পেতে ৫ টাকা জোগাড় করার মতো ক্ষমতাও আর নেই।’ তাঁর এই হাহাকার রামদেবপুর গ্রামের আকাশকে ভারী করে তুলছে।
গ্রামের বাসিন্দা সফিকুল ইসলাম ও রমেছা বেগম জানান, তাঁরা নিজেদের সাধ্যমতো মাঝেমধ্যে বিমলা রানীকে খাবার ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেন। কিন্তু তাঁরা নিজেরাও অত্যন্ত দরিদ্র। সফিকুলের মতে, এলাকার প্রায় ৯০% মানুষই দিনমজুরি করে খায়। তাঁরা বলছেন, ‘বিমলা রানীর অবস্থা এখন এমন যে, তাঁর জন্য একজন সার্বক্ষণিক সেবক প্রয়োজন। ঘরের চাল সারানোর জন্য অন্তত ২,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকা দরকার, যা আমাদের মতো গরিবদের পক্ষে জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
বিমলা রানীর এই করুণ পরিস্থিতির খবর এখন পুরো উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং সমাজের বিত্তবান মানুষেরা এগিয়ে এলে এই অসহায় বৃদ্ধার শেষ কটা দিন হয়তো স্বস্তিতে কাটবে। তাঁর জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড এবং একটি নিরাপদ থাকার ঘরের প্রয়োজন। যদি সামান্য কিছু চিকিৎসাসেবাও তিনি নিয়মিত পান, তবে হয়তো তাঁর শারীরিক কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হবে।
জীবনের এই শেষ সীমান্তে এসে বিমলা রানীর চাওয়া খুব বেশি নয়। তিনি কোনো বিলাসবহুল জীবন চান না, চান শুধু দুমুঠো নিশ্চিত ভাত আর বৃষ্টির দিনে একটু শুকনো ঠাঁই। স্থানীয় প্রশাসন ও বিত্তবানরা এগিয়ে এলে হয়তো এই বৃদ্ধার ভাগ্যে জুটবে একটু মানবিক সম্মান। বিমলা রানীর মতো অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এখন সমাজের প্রতিটি সচেতন মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।
















