রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলকালাম: লাইব্রেরিতে ঢুকে তিন শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করল রাকসু ও শিবির নেতারা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) আজ সোমবার এক ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় পিটিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) নেতা ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা। মারধরের এই তাণ্ডব শুরু হয় দুপুরে প্রক্টরের দপ্তরে এবং শেষ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির ভেতর। আহত শিক্ষার্থীরা হলেন আনাস, হাসিব এবং মাহমুদুল হাসান। তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং বর্তমানে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীন।

ঘটনার শুরু হয় একটি প্রেমের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের এক ছাত্রী একই বিভাগের মহসিন আলম নামের এক ছাত্রের বিরুদ্ধে প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। ওই ছাত্রীর দাবি, মহসিন তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং তিনি রাজি না হওয়ায় তাকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এমনকি মহসিন আত্মহত্যা করেছেন—এমন ভুয়া খবর ছড়িয়েও ওই ছাত্রীকে হুমকি দেওয়া হয়। এই অভিযোগের মীমাংসার জন্য রোববার রাতে প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান তার কার্যালয়ে একটি বৈঠক ডাকেন। সেখানে মহসিনের পক্ষে কথা বলতে আসেন তার বন্ধু আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল। বৈঠকে তারা প্রক্টরের সঙ্গে উচ্চবাচ্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

গতকালকের সেই উত্তেজনার রেশ ধরে আজ সোমবার দুপুরে আবারও প্রক্টর দপ্তরে বৈঠক বসে। সেখানে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ও অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার এক পর্যায়ে তারা আনাসকে ‘নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ’ কর্মী হিসেবে অভিযুক্ত করেন। তারা আনাসের মুঠোফোন তল্লাশি করে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে তার ছবি খুঁজে পান। এরপরই রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ও এজিএস এস এম সালমান সাব্বির সবার সামনেই আনাসকে মারধর শুরু করেন। প্রক্টর পরিস্থিতি সামাল দিয়ে তাদের সবাইকে দপ্তর থেকে বের করে দেন।

এরপর দুপুর বেলা ৩টার দিকে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়। অভিযোগ উঠেছে, আনাস ও তার বন্ধুরা মিলে রাকসু ভবনে গিয়ে সালাহউদ্দিন আম্মার ও তথ্য সম্পাদক নাজমুস সাকিবের ওপর হামলা চালান। এতে সাকিব আহত হন। এই ঘটনার পর রাকসু ও শিবিরের নেতা-কর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে আনাসদের খুঁজতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে আনাস ও তার বন্ধুরা প্রাণ বাঁচাতে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের (লাইব্রেরি) ভেতরে আশ্রয় নেন। কিন্তু হামলাকারীরা লাঠিসোঁটা, লোহার রড ও বেল্ট নিয়ে লাইব্রেরির রিডিং রুমের ভেতর ঢুকে পড়েন।

লাইব্রেরির ভেতরে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা জানান, পড়াশোনার শান্ত পরিবেশে হঠাৎ ১০০টির বেশি মানুষের একটি দল ঢুকে পড়ে। তারা যাকে পাচ্ছিল তাকেই ছাত্রলীগের ট্যাগ দিয়ে মারধর করছিল। সালাহউদ্দিন আম্মারকে একটি বড় লাঠি ও বেলচা দিয়ে আনাসকে বেধড়ক পেটাতে দেখা যায়। রিডিং রুমের সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই উগ্র আচরণের প্রতিবাদ করলে তাদেরও ধমক দেওয়া হয়। ভয়ার্ত পরিবেশে শিক্ষার্থীরা দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন। পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল বডি অনেক চেষ্টার পর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে আহত মাহমুদুল হাসানকে যখন অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছিল, তখনও তাকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে লাথি মারেন রাকসু ও শিবিরের কর্মীরা।

হামলার শিকার আনাস দাবি করেছেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নন। তিনি বলেন, ‘আমার ওপর কমপক্ষে ২০০টির বেশি আঘাত করা হয়েছে। আমার বন্ধুদের সঙ্গে ছবি থাকলেই কি আমি ছাত্রলীগ হয়ে গেলাম? কোনো বিচার না করেই আমাকে এভাবে পশুর মতো মারা হলো।’ অন্যদিকে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার নিজের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, ছাত্রলীগ কর্মীরা তাদের ওপর হামলা করেছে বলেই তারা প্রতিরোধ গড়েছেন। তিনি প্রশাসনের ব্যর্থতাকেই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেন।

এই ঘটনায় ছাত্রশিবিরের সম্পৃক্ততার কথা উঠলেও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তা অস্বীকার করেছেন। তবে ভিডিও ফুটেজে শিবির নেতা সালমান সাব্বির, ইমরান লস্কর এবং মেহেদী সজীবকে সরাসরি মারধরে অংশ নিতে দেখা গেছে। এই ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। লাইব্রেরিতে থাকা এক শিক্ষার্থী আক্ষেপ করে বলেন, পড়াশোনার জায়গায় এভাবে সশস্ত্র হামলা হওয়া মানে ১০০% নিরাপত্তা হীনতা। ছাত্রলীগ হোক বা সাধারণ ছাত্র, কাউকে এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে মারার অধিকার কারও নেই।

বর্তমানে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি শান্ত রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর জানান, আনাস ও হাসান নামের দুজনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। উপাচার্য দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবেন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে ছাত্রদল এই ঘটনাকে ‘ব্যক্তিগত বিরোধের রাজনৈতিক রূপ’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। তারা মনে করে, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বারবার এমন বিশৃঙ্খলা ঘটছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ