বাংলাদেশের আলোচিত ও বিতর্কিত টেকনাফের সাবেক পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যার ঘটনায় অবশেষে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিলো সেনাবাহিনী। সোমবার রাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক জরুরি বার্তায় নিশ্চিত করেছে যে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদকে বর্তমানে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। মূলত ২০১৮ সালে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে একরামুল হককে হত্যার দায়ে তার বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হলো। আইএসপিআর স্পষ্ট জানিয়েছে, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে পরবর্তী সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এই গ্রেপ্তারের ঠিক একদিন আগে, অর্থাৎ গত রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একরামুল হক হত্যার ঘটনায় একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা ‘ফরমাল চার্জ’ জমা দেয় প্রসিকিউশন। এই মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। সেই তালিকার অন্যতম নাম হলো ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ। ২০১৮ সালে যখন টেকনাফে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে, তখন তিনি চট্টগ্রামে র্যাব-৭-এর অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। কক্সবাজার জেলাটিও তখন তাঁর এই কমান্ডের আওতায় ছিল। ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের হওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সেনাবাহিনী তাকে নিজেদের হেফাজতে নিলো।
২০১৮ সালের ২৬ মে দিবাগত রাতে টেকনাফে তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন একরামুল হক। তিনি দীর্ঘ ১২ বছর ধরে টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। একরামুলের এই মৃত্যুকে শুরুতে র্যাব ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে প্রচার করলেও পরে একটি অডিও ক্লিপ সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে। সেই অডিওতে শোনা যায়, একরামুল যখন মারা যাচ্ছিলেন, তখন ফোনে তাঁর স্ত্রী আয়েশা বেগম এবং তাঁর শিশু সন্তানেরা সেটি শুনছিলেন। শিশুদের সেই কান্নার আওয়াজ বাংলাদেশের ১০০% মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে ঠান্ডা মাথার খুন হিসেবে বর্ণনা করেছিল। কিন্তু তৎকালীন সরকারের প্রভাবে তখন এই হত্যার কোনো সুষ্ঠু বিচার হয়নি।
সেনাবাহিনী সূত্র জানায়, ব্রিগেডিয়ার মিফতাহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে তারা। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দেশের সাধারণ নাগরিকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটবে। মিফতাহ উদ্দিনকে হেফাজতে নেওয়ার ঘটনাটি বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ৯৫% বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা এমন অনেক অভিযান পরিচালনা করতেন। তদন্তকারীরা বলছেন, তারা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি জড়িত থাকার একাধিক শক্ত প্রমাণ পেয়েছেন। মিফতাহ উদ্দিনের কমান্ডের অধীনে থাকা র্যাব সদস্যরা সেদিন কীভাবে পরিকল্পনা করে একরামুলকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, তার বিস্তারিত বিবরণ এখন ট্রাইব্যুনালের কাছে রয়েছে। সরকার ও সামরিক বাহিনী এখন চায় এই পুরো প্রক্রিয়ার একটি স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু বিচার হোক।
একরামুল হকের পরিবার দীর্ঘ ৬টি বছর ধরে ন্যায়বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। তাঁর স্ত্রী আয়েশা বেগম বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন যে, তাঁর স্বামী কোনোভাবেই মাদকের সাথে জড়িত ছিলেন না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই মামলা শুরু হওয়ায় এবং প্রধান অভিযুক্তদের একজনকে হেফাজতে নেওয়ায় পরিবারটি কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। তারা চায়, যারা তাদের বাবাকে কেড়ে নিয়েছে, তাদের প্রত্যেকের যেন সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হয়।
আজ ২৮ জুলাই একরামুল হত্যার বিচার প্রক্রিয়ার এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো। গত ৫ই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে মানবাধিকার রক্ষা এবং অতীতের অপরাধের বিচারের যে জোয়ার উঠেছে, এটি তারই প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এই বিচার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছে। তারা বলছে, বাংলাদেশে এই ধরণের অন্তত ৫০০টি ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি। ব্রিগেডিয়ার মিফতাহ উদ্দিনের বিচার শুরু হওয়া মানে হলো ভবিষ্যতে আর কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করে এমন নৃশংস কাজ করার সাহস পাবে না। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এখন থেকেই সতর্ক থাকলে অপরাধের হার অন্তত ৫০% কমে আসবে বলে সবাই আশা করছে।
















