জাতীয় কৃষক জোট নেতা আশেকী এলাহীর সহধর্মিণীর ইন্তেকাল: শোকস্তব্ধ রাজনৈতিক অঙ্গন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের রাজনৈতিক ও কৃষক আন্দোলনের পরিচিত মুখ, জাতীয় কৃষক জোটের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আশেকী এলাহী তার জীবনের অন্যতম কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছেন। গত ২৩ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার তার প্রিয় সহধর্মিণী রেহেনা খাতুন হেনা পরলোকগমন করেছেন। ৬৬ বছর বয়সে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন, রেখে গেলেন শোকাতুর এক বিশাল পরিবার ও অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী। তার মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল ৩টা মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বার্ন ইউনিটের মতো একটি জায়গায় ১০০% জীবনযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে তিনি চিরশান্তির পথে পাড়ি জমান।

রেহেনা খাতুন হেনার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসকরা তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে আর ফেরানো যায়নি। বিকেল ৩টার দিকে যখন তার মৃত্যুর খবরটি ছড়িয়ে পড়ে, তখন হাসপাতাল চত্বরে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বয়স ৬৬ হওয়া সত্ত্বেও তিনি শারীরিকভাবে বেশ সক্রিয় ছিলেন, কিন্তু অসুস্থতা তাকে কাবু করে ফেলে। চিকিৎসকদের মতে, বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে বার্ন ইউনিটের চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল এবং সেখানে বেঁচে থাকার হার অনেক সময় ২০% থেকে ৩০% এ নেমে আসে। হেনা বেগমের ক্ষেত্রেও সেই নিয়তিই সত্য হলো।

তার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে। জাসদ নেতারা এক আনুষ্ঠানিক শোকবার্তায় বলেন, আশেকী এলাহীর রাজনৈতিক সংগ্রামে তার সহধর্মিণীর অবদান অপরিসীম ছিল। একজন রাজনৈতিক কর্মীর স্ত্রী হিসেবে তিনি শতভাগ (১০০%) ধৈর্য ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। শোকবার্তায় দলটির নেতারা মরহুমার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তারা মনে করেন, রেহেনা খাতুন হেনার মতো একজন গুণী মানুষের চলে যাওয়া সমাজের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

মৃত্যুর দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজধানীর রাইনখোলা এলাকার শাইনপুকুর আবাসিক এলাকায় তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এলাকার শত শত মানুষ ও রাজনৈতিক সহকর্মীরা উপস্থিত হয়ে তাকে শেষ বিদায় জানান। জানাজা শেষে তার মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি রওনা হয় নিজ জেলা সাতক্ষীরার উদ্দেশ্যে। ঢাকা থেকে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শুক্রবার সকালে মরদেহ সাতক্ষীরা সদরে পৌঁছায়। ২৪ জুলাই শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর সাতক্ষীরা সদর এলাকায় তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর পারিবারিক কবরস্থানে নিজ বাবার কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। বাবার পাশেই শেষ ঠিকানা পাওয়ার বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের চোখে জল নিয়ে আসে।

রেহেনা খাতুন হেনার মৃত্যুতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা শোক জানিয়েছেন। জেএসএফ সংগঠক হাজী আনোয়ার হোসেন লিটন গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এছাড়াও আমেরিকান প্রেস ক্লাব অব বাংলাদেশ অরিজিনের সভাপতি এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক লায়ন হাকিকুল ইসলাম খোকন এক বার্তায় শোক জানিয়েছেন। প্রবাস থেকেও তার আত্মার শান্তি কামনায় দোয়া করা হয়েছে। প্রবাসীদের অনেক সামাজিক সংগঠন যারা বছরের বিভিন্ন সময়ে হাজার হাজার ডলার ($) আর্তমানবতার সেবায় ব্যয় করেন, তারাও আশেকী এলাহীর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। সাংবাদিক খোকন তার বার্তায় উল্লেখ করেন যে, রেহেনা খাতুন হেনা ছিলেন একজন আদর্শ মা ও প্রেরণাদায়ী নারী।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রেহেনা খাতুন হেনা ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত পরোপকারী ছিলেন। তিনি শুধু তার স্বামীর রাজনৈতিক জীবনকে গুছিয়ে রাখতেন না, বরং পাড়া-প্রতিবেশীদের বিপদেও এগিয়ে আসতেন। ৬৬ বছরের দীর্ঘ জীবনে তিনি অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছেন। তার মৃত্যুতে সাতক্ষীরা সদর এলাকায় শোকের আবহ বিরাজ করছে। স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, আশেকী এলাহী যখন কৃষকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ব্যস্ত থাকতেন, তখন পর্দার আড়ালে থেকে হেনা বেগমই সব সামলে রাখতেন। তার মতো মমতাময়ী মানুষের অভাব পূরণ করা সম্ভব নয়। এলাকার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন শতভাগ (১০০%) বিশ্বস্ত এক আশ্রয়।

এই শোকের সময় আশেকী এলাহীর পাশে দাঁড়িয়েছেন তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা। তারা বলছেন, রাজনীতি করতে গেলে পারিবারিক সমর্থন থাকাটা অনেক বড় বিষয়। আশেকী এলাহী আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছেন, তার পেছনে তার স্ত্রীর অবদান অন্তত ৫০% থেকে ৬০% বলে তারা মনে করেন। জীবনের কঠিন দিনগুলোতে হেনা বেগম যেভাবে ধৈর্য ধরেছেন, তা বর্তমান প্রজন্মের জন্য একটি বড় শিক্ষা। তার মৃত্যুতে সাতক্ষীরা ও ঢাকার পরিচিত মহলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘ সময় ধরে অনুভূত হবে। তার পরিবার এখন সবার কাছে দোয়া চেয়েছে যেন মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করেন।

পরিশেষে বলা যায়, মৃত্যু চিরন্তন হলেও রেহেনা খাতুন হেনার মতো মানুষের চলে যাওয়া হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করে। ৬৬ বছরের একটি কর্মময় জীবনের অবসান ঘটল ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে। কিন্তু তার আদর্শ ও মমতা রয়ে যাবে তার সন্তানদের মাঝে। জাসদ ও জাতীয় কৃষক জোটের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ তাকে চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। তার জানাজায় মানুষের ঢল প্রমাণ করে যে, তিনি মানুষের হৃদয়ে কতটা জায়গা করে নিয়েছিলেন। শোকসন্তপ্ত পরিবার যেন এই শোক সইবার শক্তি পায়, এটাই এখন সবার প্রার্থনা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ