চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির বড় সাফল্য: বিপুল পরিমাণ ভারতীয় নেশাজাতীয় সিরাপ জব্দ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্ত এলাকায় মাদক চোরাচালান রোধে বড় ধরনের সাফল্য দেখিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গত ২৫ জুলাই ২০২৬ তারিখ শনিবার ভোররাতে এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় নেশাজাতীয় এস্কাফ সিরাপ জব্দ করেছে ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সদস্যরা। এই অভিযানে বিজিবি কোনো পাচারকারীকে ধরতে না পারলেও বড় একটি মাদকের চালান দেশের ভেতরে ঢোকার আগেই আটকে দিতে সক্ষম হয়েছে। শিবগঞ্জ উপজেলার পাকা ইউনিয়নের বিশরশিয়া গ্রামে পরিচালিত এই অভিযানে এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় মাদকের এই মরণনেশা রুখতে বিজিবির এমন তৎপরতা এখন টক অফ দ্য টাউন।

বিজিবি সূত্র থেকে জানা গেছে, শনিবার ভোর ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে যখন চারিদিকে হালকা কুয়াশা আর অন্ধকার ছিল, ঠিক তখনই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওয়াহেদপুর বিওপির একটি বিশেষ টহলদল অভিযানে নামে। তারা জানতে পারে যে, বিশরশিয়া গ্রামের সীমান্ত দিয়ে একটি বড় চালানের চোরাচালান হতে পারে। বিজিবি সদস্যরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ওত পেতে থাকেন। পাচারকারীরা বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে মালামাল ফেলে অন্ধকারের সুযোগে পালিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১৫৭ বোতল ভারতীয় এস্কাফ সিরাপ উদ্ধার করা হয়। এই জব্দকৃত মাদকের বাজারমূল্য সম্পর্কে বিজিবি জানিয়েছে, প্রতি বোতল সিরাপের দাম অনুযায়ী মোট মূল্য দাঁড়ায় ৬২ হাজার ৮০০ টাকা। এই পরিমাণ টাকা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৫৩০ ডলারের ($) সমান।

শুধু এই একটি অভিযানেই নয়, ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়ন পুরো জুলাই মাস জুড়েই মাদকের বিরুদ্ধে ১০০% কঠোর অবস্থান নিয়েছে। চলতি জুলাই মাসে তাদের বিভিন্ন বিওপির সদস্যরা দিনরাত এক করে অভিযান চালিয়েছেন। ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এই এক মাসেই তারা ১ জন আসামিসহ মোট ৬০৫ বোতল এস্কাফ সিরাপ উদ্ধার করেছে। এছাড়া অভিযানে আরও ধরা পড়েছে ৬৪ বোতল নেশাজাতীয় ফেয়ারডিল সিরাপ এবং ৯০ বোতল বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ। বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পুরো এক মাসে জব্দ হওয়া মাদকের মোট বাজারমূল্য প্রায় ৪ লাখ ২ হাজার ৬০০ টাকা। সীমান্ত দিয়ে মাদকের অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি এখন আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (৫৩ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান, পিএসসি, এই সফল অভিযানের পর সংবাদমাধ্যমকে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, “সীমান্তে বিজিবি সদস্যরা অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করছে। আমরা মাদক পাচারের ক্ষেত্রে ০% (শূন্য শতাংশ) ছাড় দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছি। আমাদের গোয়েন্দারা সবসময় সক্রিয় থাকে যাতে কোনো চোরাচালানকারী সীমান্ত পার হতে না পারে।” অধিনায়ক আরও জানান যে, বিজিবি শুধুমাত্র মাদক নয়, বরং সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র, সোনা বা অন্য কোনো অবৈধ পণ্য পাচারের বিরুদ্ধেও সমানভাবে সজাগ রয়েছে। জব্দকৃত মাদকগুলো নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পর শিবগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

ভারত থেকে বাংলাদেশে পাচার হওয়া এই এস্কাফ সিরাপ মূলত ফেনসিডিলের একটি বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তরুণ সমাজকে ধ্বংস করার জন্য এই মরণনেশা সীমান্ত দিয়ে কৌশলে আনা হয়। অনেক সময় পাচারকারীরা স্থানীয় অসহায় মানুষদের সামান্য কিছু টাকার লোভ দেখিয়ে এসব কাজ করায়। পরিসংখ্যান বলছে, সীমান্ত এলাকার প্রায় ১৫% থেকে ২০% যুবক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই ধরণের চোরাচালানের সাথে জড়িত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিজিবি কেবল অভিযানই চালাচ্ছে না, বরং তারা সীমান্ত এলাকার মানুষকে সচেতন করার জন্যও কাজ করছে। তারা মনে করে, সামাজিকভাবে মানুষকে সচেতন করতে পারলে চোরাচালান অনেক শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব।

মাদকের এই অবৈধ কারবারের কারণে দেশের অর্থনীতি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি জনস্বাস্থ্যও বড় ধরণের হুমকির মুখে পড়ছে। পাচারকারীরা মূলত ভোররাত বা গভীর রাতকে তাদের কাজের মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নেয়। তবে ৫৩ বিজিবির টহলদল এখন ডিজিটাল মনিটরিং এবং থার্মাল ক্যামেরার মতো আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছে, যা পাচারকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, তাদের কাছে তথ্য আছে যে কিছু বড় সিন্ডিকেট সীমান্তের ওপার থেকে এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। সেসব রাঘববোয়ালদের শনাক্ত করতে কাজ করছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। বিশরশিয়া গ্রামের মতো দুর্গম এলাকাগুলোতে এখন বিজিবির টহল আগের চেয়ে দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছে।

শিবগঞ্জ থানা পুলিশ জানিয়েছে, বিজিবির পক্ষ থেকে জব্দকৃত এস্কাফ সিরাপের চালানটি তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশ এখন অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। উদ্ধারকৃত মালামালগুলো আদালতের নির্দেশে পরবর্তীতে ধ্বংস করা হবে। স্থানীয় বাসিন্দারা বিজিবির এই সাহসী ভূমিকাকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন, সীমান্তে কড়াকড়ি থাকলে এলাকায় অপরাধ কমে যায়। বিজিবির এই জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর হলে চাঁপাইনবাবগঞ্জকে দ্রুত একটি মাদকমুক্ত জেলা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। সাধারণ মানুষের দাবি, শুধু উদ্ধার নয়, বরং মাদকের এই হোতাদের যেন আইনের আওতায় আনা হয়।

পরিশেষে বলা যায়, ৫৩ বিজিবির এই অভিযান দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় এক বড় মাইলফলক। মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের যে যুদ্ধ, সেই যুদ্ধে বিজিবি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে পাচারকারীরা আরও নতুন নতুন কৌশল নিতে পারে, তবে বিজিবিও তাদের মোকাবেলায় প্রস্তুত। চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসী আশা করছে, বিজিবির এই নিরলস পরিশ্রমের ফলে তাদের সীমান্ত হবে নিরাপদ এবং সমাজ হবে সুন্দর। মাদক পাচারের এই ধারা যদি ১% ও বজায় থাকে, তবে বিজিবি তাদের লড়াই থামাবে না এমনটিই তাদের অঙ্গীকার।

সম্পর্কিত নিবন্ধ