দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। আজ শুক্রবার তিনি তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেন। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল শপথ নেওয়ার পর থেকে ৩ বছর ৩ মাস বঙ্গভবনে কাটানোর পর তিনি এখন সাধারণ জীবনে ফিরে যাচ্ছেন। তবে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরে দাঁড়ালেও দেশের আইন অনুযায়ী তিনি সারাজীবন বেশ কিছু আর্থিক ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। বাংলাদেশের ‘রাষ্ট্রপতির অবসর ভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা আইন’ অনুযায়ী একজন সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি কী কী পেতে পারেন, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে। আইন বলছে, অন্তত ৬ মাস দায়িত্ব পালন করলেই একজন রাষ্ট্রপতি এসব সুবিধার আওতায় আসেন।
একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি মাসিক কত টাকা পেনশন পাবেন, সেটি মূলত নির্ভর করে তাঁর শেষ মেয়াদের বেতনের ওপর। বর্তমানে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি পদ থেকে বিদায় নেওয়ার পর তাঁর শেষ বেতনের ৭৫% হারে মাসিক অবসর ভাতা পাবেন। সেই হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন প্রতি মাসে ৯০,০০০ টাকা পেনশন পাওয়ার যোগ্য হবেন। যদি কোনো কারণে সাবেক রাষ্ট্রপতি মারা যান, তবে তাঁর বিধবা স্ত্রী সেই অবসর ভাতার দুই-তৃতীয়াংশ টাকা আমৃত্যু পাবেন। তবে সাহাবুদ্দিন চাইলে মাসিক ভাতার বদলে এককালীন টাকা বা আনুতোষিকও গ্রহণ করতে পারেন। এই এককালীন টাকার পরিমাণ হবে ১ বছরের অবসর ভাতার তত গুণ, যত বছর তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। যেহেতু তিনি ৩ বছরের বেশি দায়িত্ব পালন করেছেন, তাই তাঁর ক্ষেত্রে এই অঙ্কটি কয়েক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
টাকা-পয়সার পাশাপাশি মো. সাহাবুদ্দিন একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাজকীয় কিছু নাগরিক সুবিধাও পাবেন। আইন অনুযায়ী, সরকার তাঁকে একজন ব্যক্তিগত সহকারী এবং একজন সাহায্যকারী বা অ্যাটেনডেন্ট প্রদান করবে। তাঁর দাপ্তরিক কাজকর্ম চালানোর জন্য সরকার প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেবে। চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে তিনি একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সমান সুযোগ-সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ, দেশে বা বিদেশে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনে তিনি সরকারের তরফ থেকে ১০০% সহায়তা পাবেন। এ ছাড়া সরকারি কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চাইলে তিনি বিনামূল্যে সরকারি যানবাহন ব্যবহারের সুবিধা পাবেন। তাঁর বাসভবনে একটি টেলিফোন সংযোগ থাকবে এবং এর মাসিক বিল সরকার একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত পরিশোধ করবে।
ভ্রমণের ক্ষেত্রেও মো. সাহাবুদ্দিন বিশেষ সুবিধা ভোগ করবেন। একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি ও তাঁর স্ত্রী উভয়েই লাল রঙের ‘কূটনৈতিক পাসপোর্ট’ পাবেন। এই পাসপোর্ট থাকলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণে এবং এয়ারপোর্টে ভিআইপি মর্যাদা পাওয়া যায়। এছাড়া দেশের ভেতরে কোনো জেলায় ভ্রমণের সময় তিনি সরকারি সার্কিট হাউস বা রেস্টহাউসে কোনো ভাড়া ছাড়াই অবস্থান করতে পারবেন। বর্তমান বাজারদরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সরকার সময়ে সময়ে এসব সুবিধার পরিধি আরও বাড়াতে পারে। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে এই সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা হয় যাতে সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানরা মর্যাদাপূর্ণ জীবন কাটাতে পারেন।
তবে এই সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু কড়া শর্তও রয়েছে। যদি মো. সাহাবুদ্দিন ভবিষ্যতে সরকারের অন্য কোনো লাভজনক পদে বা চাকরিতে যোগ দেন এবং সেখান থেকে বেতন বা সুবিধা গ্রহণ করেন, তবে তাঁর রাষ্ট্রপতির পেনশন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। আবার যদি কোনো আদালত তাঁকে নৈতিক স্খলনজনিত কোনো অপরাধে দণ্ডিত করে বা শাস্তি দেয়, তবে তিনি আর এসব সুবিধা পাবেন না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বাংলাদেশের উচ্চ আদালত যদি কখনও ঘোষণা করে যে তাঁর রাষ্ট্রপতি পদে বসাটি অসাংবিধানিক বা অবৈধ ছিল, তবে তিনি এক মুহূর্তের জন্যও আর কোনো সুবিধা ভোগ করতে পারবেন না। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই আইনি বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইন পর্যালোচনায় দেখা যায়, মো. সাহাবুদ্দিন যদি স্বাভাবিকভাবে অবসরে যেতেন বা বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল পদত্যাগ করেন, তবে তিনি সুবিধাগুলো পাবেন। কিন্তু তাঁর নিয়োগ বা মেয়াদের বিষয়ে ভবিষ্যতে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। রাষ্ট্রপতির পেনশনের অঙ্কটি যদিও মাসিক ৯০,০০০ টাকা, কিন্তু এর সাথে ব্যক্তিগত সহকারী, নিরাপত্তা এবং চিকিৎসা খরচের হিসাব যোগ করলে সরকারের তহবিল থেকে প্রতি মাসে একটি বড় অঙ্কের অর্থ খরচ হবে। সাবেক রাষ্ট্রপতির পরিবারও এই সুবিধার বড় একটি অংশের অংশীদার হতে পারেন। বিশেষ করে চিকিৎসা ও পাসপোর্টের সুবিধাটি তাঁর স্ত্রীর জন্য ১০০% নিশ্চিত করা হয়েছে আইনে।
বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদটি সর্বোচ্চ সম্মানের। তাই পদ ছাড়ার পরেও সেই সম্মানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রাষ্ট্র এই বিশেষ আইনটি তৈরি করেছে। মো. সাহাবুদ্দিনের আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ কিংবা বি চৌধুরীও এই আইনের আওতায় বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করেছেন। তবে সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে যেহেতু আন্দোলন ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে পদত্যাগের ঘটনাটি ঘটেছে, তাই সাধারণ মানুষের নজর এখন আইনের প্রয়োগের দিকে। আইন বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, যদি ভবিষ্যতে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বড় ধরণের ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত না হয়, তবে তিনি আমৃত্যু এই ৯০,০০০ টাকা পেনশন এবং কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহারের অধিকারী থাকবেন।
সব মিলিয়ে মো. সাহাবুদ্দিনের বিদায়ের পর এখন আলোচনা হচ্ছে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন এবং সাহাবুদ্দিনের এই ৩ বছর ৩ মাসের মেয়াদ ইতিহাসের পাতায় কীভাবে মূল্যায়িত হবে। তিনি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে এখন ৯০,০০০ টাকার পেনশনে জীবন কাটাবেন। তবে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রটোকল বজায় রাখা হবে কি না, তা সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানরা সবসময়ই একটি বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হন, যদি না আদালত বা সংসদ তাঁদের সেই অধিকার কেড়ে নেয়। সাহাবুদ্দিনের প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে জনগণের মধ্যে যে আলোচনা চলছে, তা মূলত দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতারই একটি অংশ।
















