মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় সেনানী সৈয়দ জাফর সাজ্জাদের প্রয়াণ দিবস: জাসদ কার্যালয়ে শ্রদ্ধা ও স্মরণের মহিমা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অকুতোভয় সংগঠক এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের দুইবারের সাবেক নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ জাফর সাজ্জাদের প্রয়াণ দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে। গত ১৬ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার ছিল এই দেশপ্রেমিক নেতার মৃত্যুবার্ষিকী। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেমন রাজপথ কাঁপিয়েছেন, তেমনি যুদ্ধের ময়দানে আঞ্চলিক কমান্ডার হিসেবে বীরত্বের সাথে লড়াই করেছেন। তাঁর এই প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে ঢাকার তোপখানা রোডে জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যেখানে দলমত নির্বিশেষে মানুষ তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

সকাল থেকেই তোপখানা রোডের কার্যালয়ে নেতাকর্মীরা ভিড় জমাতে শুরু করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রয়াত সৈয়দ জাফর সাজ্জাদের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে উপস্থিত সকলে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাসদের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজমুল হক প্রধান। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, জাফর সাজ্জাদ ছিলেন এমন একজন নেতা যিনি পদের চেয়ে আদর্শকে বড় করে দেখতেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁর অবদান ১০০% অনস্বীকার্য। আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি এক অনন্য অনুপ্রেরণার নাম।

সৈয়দ জাফর সাজ্জাদ শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যখন আঞ্চলিক কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন তাঁর রণকৌশল দেখে পাকিস্তানি বাহিনীও তটস্থ থাকতো। উপস্থিত নেতারা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, সে সময় মুক্তিযোদ্ধারা ১ টাকা বা ১০০ ডলার ($) এর দিকে তাকাতেন না, তারা দেশের স্বাধীনতার জন্য ১০০% জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। জাফর সাজ্জাদ সেই বীরদেরই একজন যিনি নিজের জীবনের পরোয়া না করে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। জাসদের মতো একটি আদর্শিক দলকে শক্তিশালী করতে তিনি যেভাবে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছেন, তা বর্তমানের অনেক রাজনীতিবিদের কাছে অকল্পনীয়।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জাসদের স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ও ডাকসুর সাবেক জিএস ডা. মোস্তাক হোসেন। তিনি বলেন, জাফর সাজ্জাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল অতুলনীয়। তিনি যখন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তখন দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ও আদর্শিক চর্চা প্রায় ৯০% বৃদ্ধি পেয়েছিল। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আনারুল ইসলাম বাবু, করিম সিকদার, মনজুর আহমেদ এবং রোকনুজ্জামান রোকন। আব্দুস সালাম খোকন, নুরুন্নবী, কামরুল ইসলাম ও মোকসেদুর রহমান লবুসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের অসংখ্য নেতাকর্মী এদিন নেতার স্মরণে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। ছাত্রনেতা গৌতম শীলের নেতৃত্বে একদল তরুণ কর্মীও এদিন শপথ নেন যে তারা জাফর সাজ্জাদের দেখানো পথেই হাঁটবেন।

সৈয়দ জাফর সাজ্জাদের এই প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন মহল থেকে শোক ও শ্রদ্ধার বার্তা এসেছে। জেএসএফ-বাংলাদেশ এর সংগঠক হাজী আনোয়ার হোসেন লিটন এবং নিউজ পোর্টাল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক লায়ন হাকিকুল ইসলাম খোকন এক যুক্ত বিবৃতিতে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। বিবৃতিতে তারা বলেন, জাফর সাজ্জাদ ছিলেন নীতি ও নৈতিকতার মূর্ত প্রতীক। সাংবাদিক ও লেখক সমাজ তাঁর চলে যাওয়াকে এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরাও জুম ও অন্যান্য ভার্চুয়াল মাধ্যমে জাফর সাজ্জাদকে স্মরণ করেন এবং তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

স্মরণসভায় বক্তারা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন। তারা উল্লেখ করেন যে, জাফর সাজ্জাদের মতো ত্যাগী নেতারা আজ বড়ই প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে যেখানে রাজনীতির বাজারদর নিয়ে আলোচনা হয়, সেখানে জাফর সাজ্জাদরা শিখিয়ে গেছেন কীভাবে নিঃস্বার্থভাবে দেশের সেবা করতে হয়। জাসদ নেতারা দাবি করেন, জাফর সাজ্জাদের জীবনী পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত যাতে ৫% বা ১০% নয় বরং দেশের সকল শিক্ষার্থী তাঁর দেশপ্রেম সম্পর্কে জানতে পারে। বিশেষ করে আঞ্চলিক কমান্ডার হিসেবে তাঁর বীরত্বগাথা নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছানো দরকার।

অনুষ্ঠানে মহিউদ্দিন আহমেদ, তৈয়ব হোসেন নিপুসহ আরও অনেক সক্রিয় কর্মী বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, জাফর সাজ্জাদ কখনও ক্ষমতার মোহে অন্ধ হননি। তিনি দুইবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন তৃণমূলের ভালোবাসায়। রাজনৈতিক বৈষম্য নিরসনে তিনি যে ভূমিকা রেখেছিলেন, তা আজও জাসদের প্রতিটি কর্মীর হৃদয়ে গেঁথে আছে। তারা মনে করেন, আজকের দিনে যখন মূল্যস্ফীতি বা অর্থনৈতিক সংকটের কথা আসে, তখন জাফর সাজ্জাদের মতো সাহসী নেতাদের অভাব খুব বেশি অনুভূত হয়। কারণ তিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিজের চোখে দেখার জন্য মেঠোপথে হেঁটে বেড়াতেন।

পরিশেষে, দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। সৈয়দ জাফর সাজ্জাদের প্রয়াণ দিবসের এই কর্মসূচি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, এটি ছিল আদর্শিক পুনর্জাগরণের এক মুহূর্ত। উপস্থিত সকলে একমত হন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে জাফর সাজ্জাদের মতো সাহসী ও স্পষ্টভাষী মানুষের আদর্শকে লালন করতে হবে। তোপখানা রোডের সেই ছোট কার্যালয়টি এদিন যেন এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল, যেখানে সবাই মিলে এই শপথ নিয়েছিলেন যে তারা মাদকমুক্ত ও শোষণমুক্ত একটি সোনার বাংলা গড়ে তুলবেন। ১৬ জুলাইয়ের এই আয়োজন সফলভাবে শেষ হওয়ার মাধ্যমে এটিই প্রমাণিত হলো যে, বীরেরা কখনও মরে যান না, তারা বেঁচে থাকেন মানুষের ভালোবাসায় আর কাজের মাধ্যমে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ