ভুল-ত্রুটির জন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইলেন আব্দুল কাদের মির্জা: ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং বসুরহাট পৌরসভার সাবেক মেয়র আব্দুল কাদের মির্জা আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন। তবে এবার কোনো কঠোর বক্তব্য নয়, বরং অতীতের সব ভুল-ত্রুটির জন্য তিনি দেশবাসীর কাছে খোলাখুলিভাবে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি মনে করেন, রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে এবং মানুষের মন জয় করতে হলে এখন আত্মশুদ্ধির সময় এসেছে। গত ২২ জুলাই ২০২৬, বুধবার বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় এবং নিউ ইয়র্ক সময় সকাল ১১টায় আয়োজিত একটি বিশেষ ভার্চুয়াল সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে যুক্ত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন। “স্মরণে ৭১, হৃদয়ে বাংলাদেশ” নামক একটি সংগঠন এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছিল, যেখানে দেশ-বিদেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি অংশ নেন।

আব্দুল কাদের মির্জা তাঁর বক্তব্যে আত্মশুদ্ধি এবং আত্মসমালোচনার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেন যে, কোনো রাজনৈতিক দল যদি দীর্ঘ সময় সঠিক পথে চলতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই নিজের ভুলগুলো স্বীকার করতে হবে। তাঁর মতে, আত্মসমালোচনা হলো আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ, যা রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ পথকে আরও মসৃণ করে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, দলের গুটিকয়েক নেতাকর্মীর ভুল সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে আওয়ামী লীগের মতো একটি প্রাচীন ও জনমুখী দল সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে মাঝে মাঝে ভুল বার্তা পৌঁছায়। এই সুযোগটিই গ্রহণ করে দেশবিরোধী অপশক্তিরা। তারা জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে আওয়ামী লীগ মানুষের বন্ধু নয়, বরং শত্রু। মির্জা মনে করেন, এই ধারণাগুলো ভাঙতে হলে প্রতিটি নেতাকর্মীকে ১০০% সততার সাথে কাজ করতে হবে।

এই ভার্চুয়াল সভায় আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। বিশেষ করে প্রখ্যাত নিউরোসার্জন ডা. অধ্যাপক শাহনেওয়াজ বারী তাঁর বক্তব্যে একটি বড় ঘোষণা দেন। তিনি জানান, আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং সাবেক পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারেন। এই ঘোষণাকে তিনি একটি অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বক্তাদের মতে, বর্তমান বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ মোটেও ভালো নেই এবং দেশের এই কঠিন সময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ১০/১০ ভাগ জরুরি হয়ে পড়েছে। জনগণের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতে এবং দেশকে পুনরায় উন্নয়নের পথে ফিরিয়ে নিতে তাঁর বিকল্প নেই বলেও তারা দাবি করেন। সভায় উপস্থিত বক্তারা মনে করেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতির চাকা যেভাবে স্থবির হয়ে আছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য অভিজ্ঞ নেতৃত্বের প্রয়োজন।

সভায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাংবাদিক এবং গুণীজনেরা বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। তাদের আলোচনায় উঠে আসে যে, প্রবাসীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি চিন্তিত। একজন প্রবাসী সাংবাদিক জানান, প্রবাস থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রবাহে কিছুটা ওঠানামা দেখা দিচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ১০% থেকে ১৫% প্রভাব ফেলছে। গ্রীস, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুক্ত হওয়া আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী মানুষগুলো এখন দেশ ও দেশের বাইরে নানা চাপের মুখে আছে। তবুও তারা বিশ্বাস করেন যে, আওয়ামী লীগ যেহেতু বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে, তাই এই দলকে দমানো সহজ হবে না। কোনো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তই এই দলের শেকড় উপড়ে ফেলতে পারবে না বলে তারা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট মানিক লাল ঘোষ এবং সঞ্চালনায় ছিলেন কবি ও সাংবাদিক সচিব শফিক বাবু। সভায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, গ্রীসসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫০ জন সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী অংশ নেন। বক্তাদের তালিকায় ছিলেন গ্রীস আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বাবুল হাওলাদার, প্রবীণ সাংবাদিক লায়ন হাকিকুল ইসলাম খোকন, এবং যুক্তরাজ্য প্রবাসী সেলিনা আকতার জোছনা। তারা সবাই একমত হন যে, দলের ভেতর যে শুদ্ধি অভিযান আব্দুল কাদের মির্জা চাইছেন, তা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা গেলে আওয়ামী লীগ আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরবে। বক্তারা বলেন, সাধারণ মানুষ এখন ৫% বা ১০% উন্নয়ন নয়, বরং তাদের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা চায়।

আব্দুল কাদের মির্জার এই ক্ষমা প্রার্থনা রাজনৈতিক মহলে একটি বড় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেছেন যে, অতীতে কিছু ভুল হয়েছে যা মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি করেছে। তবে তিনি আশা করেন যে, ক্ষমা এবং সংশোধনের মাধ্যমে সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে ফেলা সম্ভব। বিপ্লব বা পরিবর্তনের কথা বলে যারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়, তাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে আওয়ামী লীগকে আরও সুসংগঠিত হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের সাথে দূরত্ব কমিয়ে আনার ওপর জোর দেন এই নেতা। তিনি বলেন, “আমরা মানুষের জন্য কাজ করি, তাই মানুষের কাছে ক্ষমা চাইতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই।”

সভার শেষ পর্যায়ে বক্তারা দেশের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক ঐক্য এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। প্রবাসী সাংবাদিকরা উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের ($) দামের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যেভাবে হিমশিম খাচ্ছে, তা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া দরকার। সব মিলিয়ে আব্দুল কাদের মির্জার এই বক্তব্য এবং শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বার্তা রাজনৈতিক মহলে নতুন করে মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। দলীয় কর্মীরা এখন ডিসেম্বরের প্রতীক্ষায় আছেন এবং তারা মনে করছেন, এই ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমেই দল আবার নতুন উদ্দীপনায় যাত্রা শুরু করবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ