চুয়াডাঙ্গার ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ: ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে দ্বন্দ্ব ও কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মো: মিনারুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রতিনিধি

চুয়াডাঙ্গা জেলার একমাত্র উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং খুলনা বিভাগের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ’ এখন এক চরম সংকটের মুখে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা এবং ট্রাস্টি বোর্ডের বৈধতা নিয়ে দুটি শক্তিশালী পক্ষের মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে যে, যেকোনো সময় বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মচারীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আজ বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই ২০২৬) প্রধান ফটকে নোটিশ ঝুলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের এই সিদ্ধান্তে শত শত শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর প্রশাসনিক ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ছিল চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার সেলুনের পরিবারের হাতে। দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর ধরে তারা এককভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করে আসছিলেন। তবে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) কিছু গোপন চিঠি এবং যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (জয়েন্ট স্টক) নতুন কিছু কাগজপত্রের বরাতে অন্য একটি পক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি তুলেছে। এই পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রতিষ্ঠাকালীন ট্রাস্টি বোর্ডের ট্রেজারার মো. আলীম উদ্দিন লস্কর এবং আব্দুর রাজ্জাক। তাদের দাবি, তারা এখন আইনগতভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ অভিভাবক।

ঘটনার সূত্রপাত হয় গত মঙ্গলবার। সেদিন আলীম লস্করের অনুসারীরা হঠাৎ করে ক্যাম্পাসে অবস্থান নেন এবং প্রশাসনিক ভবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কক্ষে তালা লাগিয়ে দেন। বুধবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং রেজিস্ট্রারের কক্ষসহ বেশ কিছু দপ্তরে তারা নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। যদিও পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তালা খুলে দেওয়া হয়, কিন্তু ক্যাম্পাসে উত্তেজনা কমেনি বরং বেড়েছে। আলীম লস্কর সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছেন যে, ২০১৪ সালে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং কোনো আইনগত ভিত্তি ছাড়াই সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার সেলুন তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি অবৈধ ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, গত ১০ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের চেয়ে লুটপাট বেশি হয়েছে। এখন জয়েন্ট স্টকের অনুমোদন নিয়ে তারা মো. আলীম উদ্দিন লস্করকে চেয়ারম্যান, আব্দুর রাজ্জাককে সেক্রেটারি এবং তানভীর হুদাকে ট্রেজারার মনোনীত করে নতুন কমিটি গঠন করেছেন।

এই ক্ষমতার লড়াইয়ের পেছনে লুকিয়ে আছে বিশাল অংকের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষিত স্থায়ী আমানত বা এফডিআর-এর প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা (যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় $১২৫,০০০ ডলারের সমান) নিয়ম বহির্ভূতভাবে ব্যাংক থেকে তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া ইউজিসির আইন অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জমিতে স্থায়ী ক্যাম্পাস থাকার কথা থাকলেও, এখানে ভাড়া বাড়িতে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতি সেমিস্টারে অতিরিক্ত ২০% থেকে ৩০% ফি আদায় করা হচ্ছে। নিয়োগের ক্ষেত্রেও চরম স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০% গুরুত্বপূর্ণ পদে সাবেক এমপির পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়-স্বজনদের বসানো হয়েছে, যাদের অনেকেরই প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই।

আলীম লস্করের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চান এবং লুটপাট হওয়া অর্থ উদ্ধার করতে চান। তারা অভিযোগ করেন, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার নাফিউল ইসলাম জোয়ার্দার শান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নিয়মকানুন মানেন না এবং তিনি মূলত একটি বিশেষ পরিবারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। মঙ্গলবার ও বুধবার তারা যখন ক্যাম্পাসে গিয়েছিলেন, তখন তাদের ওপর হামলা করার চেষ্টাও করা হয়েছিল বলে তারা অভিযোগ করেন। অন্যদিকে, সাবেক সংসদ সদস্যের পরিবারের পক্ষের কাউকে আজ ক্যাম্পাসে পাওয়া যায়নি। অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার নাফিউল ইসলাম জোয়ার্দার শান্তর সাথে মোবাইল ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তার ব্যক্তিগত নম্বরটি দীর্ঘক্ষণ বন্ধ পাওয়া যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা এখানে রাজনীতি করতে আসিনি, পড়াশোনা করতে এসেছি। আমাদের সেমিস্টার পরীক্ষার ফি জমা দেওয়া আছে, অথচ এখন শুনছি বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেন এই ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে?” বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানিয়েছেন যে, তাদের বেতন-ভাতা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য করা হচ্ছে। যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে বড় করে দেখায় শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে অনেক আগেই। এখন মালিকানা দ্বন্দ্ব সেই কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে।

চুয়াডাঙ্গার সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছে, ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি এই জেলার একটি আবেগের জায়গা। এখানে প্রায় ২,০০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান হওয়া উচিত। কিন্তু গায়ের জোরে ক্যাম্পাস দখল বা তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য লজ্জাজনক। জয়েন্ট স্টক এবং ইউজিসি’র উচিত দ্রুত এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা এবং কারা প্রকৃত মালিক তা নির্ধারণ করে দিয়ে প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণ করা। অন্যথায়, চুয়াডাঙ্গার একমাত্র বেসরকারি এই বিশ্ববিদ্যালয়টি চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এবং এর আশেপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কোনো পক্ষ যেন আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে, সেজন্য জেলা প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে তালাবদ্ধ ক্যাম্পাসের নিরবতা যেন এক বিশাল ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা এখন কেবল একটিই প্রত্যাশা করছেন দ্রুত সকল সমস্যার সমাধান হবে এবং আবারও ক্লাসরুমে ফিরে আসবে চাঞ্চল্য। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনা থেকে রাজনীতির কালো ছায়া দূর হবে এবং প্রকৃত শিক্ষানুরাগীদের হাতেই ফিরবে ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটির দায়িত্ব।

সম্পর্কিত নিবন্ধ