ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তজনা কি মাঠের লড়াই শেষ হওয়ার সাথে সাথেই মিটে যায়? মোটেও না। ফাইনালের বাঁশি বাজার তিন দিন পরও সেই রেশ রয়ে গেছে সাধারণ ফুটবল ভক্তদের মনে। আর সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে ফিফা ঘোষণা করল বিশ্বকাপের সেরা একাদশ। তবে এই একাদশটি ফিফার কোনো বিশেষজ্ঞ দল নয়, বরং সারা বিশ্বের লাখ লাখ ফুটবল প্রেমীর সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছে। এই স্বপ্নের একাদশে যেমন অনেক চেনা তারকাদের জয়জয়কার দেখা গেছে, তেমনি বাদ পড়েছেন অনেক বড় বড় নাম। ভক্তদের বিচারে ৪-৩-৩ ছকে সাজানো এই দলে সবচেয়ে বেশি আধিপত্য দেখিয়েছে চ্যাম্পিয়ন স্পেন এবং সেমিফাইনালে খেলা ফ্রান্স। এই দুই দেশের ৩ জন করে মোট ৬ জন খেলোয়াড় একাদশে জায়গা করে নিয়েছেন।
গোটা টুর্নামেন্টে ভক্তদের সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে যে নামটি, সেটি হলো গোলরক্ষক পজিশন। কোনো বিখ্যাত দেশের গোলরক্ষক নয়, বরং কেপ ভার্দের ভোজিনিয়া গোলবারের নিচে নিজের জায়গাটি পাকা করেছেন। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে এসে কেপ ভার্দে যে বীরত্ব দেখিয়েছে, তার পেছনের ১০০% কৃতিত্বই দেওয়া হচ্ছে এই ভোজিনিয়াকে। তিনি একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় চমক হয়ে ওঠেন। ভক্তদের ভোটেও তিনি সবার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। একাদশে থাকা বাকি সবার চেয়ে বেশি ৩৯.৬% শতাংশ ভোট একাই পেয়েছেন ভোজিনিয়া। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বড় কোনো দলের হয়ে না খেলেও কেবল পারফরম্যান্স দিয়েই মানুষের মন জয় করা সম্ভব।
রক্ষণভাগের দিকে তাকালে দেখা যায় ভক্তরা দৃঢ়তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। চারজনের রক্ষণভাগে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন স্পেনের মার্ক কুকুরেয়া ও পেদ্রো পোরো। কুকুরেয়া পুরো টুর্নামেন্টে এক মিনিটের জন্যও মাঠের বাইরে যাননি এবং সতীর্থদের দিয়ে দুটি গোল করিয়েছেন। চ্যাম্পিয়ন স্পেন পুরো আসরে মাত্র ১টি গোল হজম করে ৭টি ‘ক্লিন শিট’ রাখার এক অনন্য রেকর্ড গড়েছে। তাদের সাথে রক্ষণ সামলাতে যোগ দিয়েছেন আর্জেন্টিনার লড়াকু ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ এবং ফ্রান্সের দায়ো উপামেকানো। এই চারজন ডিফেন্ডার পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে দেওয়ালের মতো দাঁড়িয়ে থেকে প্রতিপক্ষের আক্রমণগুলো রুখে দিয়েছেন, যা ভক্তদের নজরে এসেছে।
মাঝমাঠের লড়াইয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনের রদ্রি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ জেতা এই স্প্যানিশ তারকা ভক্তদের ভোটেও অবধারিতভাবে একাদশে জায়গা পেয়েছেন। তাঁর সাথে মাঝমাঠে আছেন ফ্রান্সের তরুণ প্রতিভা মাইকেল ওলিসে, যিনি পুরো আসরে সর্বোচ্চ ৭টি অ্যাসিস্ট করেছেন। এছাড়া ইংল্যান্ডের পোস্টার বয় জুড বেলিংহামও মাঝমাঠে নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছেন। ইংল্যান্ড প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল না পেলেও বেলিংহাম ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন দুর্দান্ত এবং আসরে ৭টি গোল করেছেন। মাঝমাঠের এই ত্রয়ী আসলে আধুনিক ফুটবলের গতি এবং বুদ্ধিমত্তার এক দারুণ উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
আক্রমণভাগটি সাজানো হয়েছে যেন ফুটবল ইতিহাসের তিন মহাতারকাকে দিয়ে। এখানে আছেন বর্তমান বিশ্বের সেরা তিন স্ট্রাইকার লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং আর্লিং হলান্ড। এমবাপ্পে ১০টি গোল করে ‘গোল্ডেন বুট’ জেতার পাশাপাশি আসরে ৪টি গোল করিয়েছেন। টানা দ্বিতীয়বার গোল্ডেন বুট জেতার পথে তিনি এখন বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেছেন। ভক্তদের ভোটেও তিনি ২৯.৬% ভোট পেয়ে দ্বিতীয় জনপ্রিয় খেলোয়াড় হয়েছেন। তাঁর সাথে ৩৯ বছর বয়সেও ফুটবল জাদুকর মেসি প্রমাণ করেছেন কেন তিনি বিশ্বসেরা। ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলার মূল কারিগর ছিলেন তিনিই। আর নরওয়ের আর্লিং হলান্ড কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিলেও এর মধ্যেই ৭ গোল করে আক্রমণভাগে নিজের জায়গা পাকা করেছেন।
তবে এই একাদশ নিয়ে কিছুটা বিতর্কও দেখা দিয়েছে। স্পেনের হয়ে দুর্দান্ত খেলা তরুণ প্রতিভা লামিনে ইয়ামাল কেন এই তালিকায় জায়গা পাননি, তা নিয়ে ভক্তদের একাংশ কিছুটা হতাশ। আবার ল্যাটিন আমেরিকার ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিলের একজন খেলোয়াড়কেও এই একাদশে খুঁজে পাওয়া যায়নি। আসলে ভক্তদের ভোটে অনেক সময় জনপ্রিয়তার চেয়ে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স বেশি গুরুত্ব পায়। এই একাদশটি আসলে এবারের বিশ্বকাপের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি, যেখানে তারুণ্যের সাথে অভিজ্ঞতার এক মেলবন্ধন ঘটেছে। নরওয়ে বা কেপ ভার্দের মতো ছোট দলগুলো থেকেও যে বিশ্বসেরা খেলোয়াড় উঠে আসতে পারে, ফিফার এই একাদশ সেটিই প্রমাণ করল।
ফিফার ঘোষিত এই সেরা একাদশটি হলো: গোলরক্ষক ভোজিনিয়া; রক্ষণভাগে পেদ্রো পোরো, দায়ো উপামেকানো, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও মার্ক কুকুরেয়া; মাঝমাঠে রদ্রি, মাইকেল ওলিসে ও জুড বেলিংহাম; এবং আক্রমণভাগে লিওনেল মেসি, আর্লিং হলান্ড ও কিলিয়ান এমবাপ্পে। এই ফুটবলাররা কেবল মাঠেই লড়েননি, বরং তাঁদের পায়ের জাদুতে মুগ্ধ করেছেন কোটি কোটি দর্শককে। বিশ্বকাপ শেষ হলেও এই ১১ জনের বীরত্বগাঁথা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় অনেকদিন অমলিন হয়ে থাকবে। ভক্তদের এই ভালোবাসা তাঁদের ক্যারিয়ারে এক নতুন পালক যোগ করল।
















