গাজী নজরুলের বহিষ্কারে খুশিতে মিষ্টি বিতরণ: এমপি পদ বাতিলের দাবিতে উত্তাল শ্যামনগর

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন উৎসবের আমেজ। তবে এটি কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসব নয়, বরং তাঁদের নিজ এলাকার সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করার খুশিতে এই আয়োজন। ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ‘বিতর্কিত ভিডিও’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েক দিন ধরেই এলাকায় টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বুধবার বিকেলে যখন খবর আসে যে, নৈতিক স্খলনের দায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাঁকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে, তখন যেন সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাঁধভাঙা উল্লাসে পরিণত হয়। সন্ধ্যার পর থেকেই শ্যামনগরের মোড়ে মোড়ে লোকজনকে একে অপরকে মিষ্টি খাইয়ে আনন্দ করতে দেখা গেছে।

বুধবার বিকেলে রাজধানী ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে গাজী নজরুলের ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয় এবং দলীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পেশ করা হয়। তদন্তে তাঁর নৈতিক স্খলনের বিষয়টি ১০০% নিশ্চিত হওয়ায় দলের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাঁকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াত। এই খবরটি যখনই অনলাইনে বা সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক তখনই অর্থাৎ সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে শ্যামনগর চৌরাস্তা এবং বংশীপুর মোড়ে শত শত মানুষ জড়ো হতে থাকেন। সেখানে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ও সাধারণ লোকজন একে অপরকে মিষ্টিমুখ করান। অনেককে দেখা যায় বড় বড় বাক্সে করে মিষ্টি নিয়ে এসে পথচারীদের মাঝে বিতরণ করছেন।

মিষ্টি বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় বিএনপি কর্মী মো. মনিরুজ্জামান সোহাগ। তিনি আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, “গাজী নজরুল একজন প্রবীণ নেতা হিসেবে যে কাজ করেছেন, তাতে আমাদের পুরো এলাকার মাথা নিচু হয়ে গিয়েছিল। একজন সংসদ সদস্যের কাছ থেকে সমাজ এমনটা আশা করে না। জামায়াতে ইসলামী তাঁকে বহিষ্কার করে সঠিক কাজ করেছে। আমরা ১০০ জন মানুষকে এখানে মিষ্টি খাইয়েছি কারণ এলাকার সাধারণ মানুষ এখন অনেক বেশি স্বস্তি বোধ করছে।” সোহাগের মতো আরও অনেকেই মনে করেন, এই বহিষ্কারের মাধ্যমে সমাজে একটি শক্ত বার্তা গেছে যে, বড় নেতা হলেই পার পাওয়া যায় না।

রাত বাড়ার সাথে সাথে এই আনন্দ উল্লাস আরও ছড়িয়ে পড়ে। শ্যামনগর উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সোলায়মান কবির এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “নৈতিক স্খলনের দায়ে গাজী নজরুলকে দল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, এটি প্রশংসনীয়। এর জন্য আমি জামায়াতে ইসলামীকে ধন্যবাদ জানাই। তবে এখানেই শেষ নয়। আমাদের প্রত্যাশা আরও বেশি। তিনি যে সংসদ সদস্য পদটি দখল করে আছেন, সেটিও অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, শুধু দলের পদ হারানোই যথেষ্ট নয়, তাঁকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো নেতা এমন কাজ করার সাহস না পান। স্থানীয়দের দাবি, এই ঘটনাটি শ্যামনগরের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে এবং এর সংশোধন হওয়া জরুরি।

সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের মধ্যে এই বহিষ্কারের ঘটনাটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও অধিকাংশ নেতাই কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান বুধবার রাতে জানান, “আমাদের দল একটি নৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে চলে। সেখানে কার কী পদ, তা বড় কথা নয়; আদর্শ ঠিক রাখাটাই বড় কথা। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে আমরা সবাই স্বাগত জানাচ্ছি।” তিনি স্বীকার করেন যে, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সঠিক সময়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে সেই মর্যাদা দ্রুতই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তাঁর মতে, জামায়াতের কর্মীরা এই সিদ্ধান্তে বিভ্রান্ত না হয়ে বরং দলের প্রতি আরও শ্রদ্ধাশীল হবেন।

৭৪ বছর বয়সী গাজী নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে এবার দিয়ে ৩ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ১৯৯১ ও ২০০১ সালেও তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন। একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদের এমন ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও যখন মোবাইলে মোবাইলে ঘুরতে থাকে, তখন সাধারণ ভোটারদের মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়েছিল, তার প্রমাণ আজকের এই মিষ্টি বিতরণ। স্থানীয় অনেক প্রবীণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “আমরা যাঁকে ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছি, তাঁর কাছ থেকে এমন আচরণ দেখা অত্যন্ত লজ্জার। এটি আমাদের সন্তানদের ওপর বাজে প্রভাব ফেলছে।” শ্যামনগরের সাধারণ মানুষ মনে করছে, গাজী নজরুল এখন তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন।

এলাকাবাসীর দাবি এখন আরও জোরালো হচ্ছে। তাঁরা শুধু মিষ্টি বিতরণে থেমে থাকতে চান না। শ্যামনগরের বিভিন্ন মোড়ে এখন একটাই আলোচনা কবে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বা অন্য কোনো ধারায় তাঁর পদ টিকবে কি না, তা নিয়ে এখন আইনি লড়াই শুরু হতে পারে। তবে জনমত যে তাঁর বিপক্ষে চলে গেছে, তা আজকের শত শত মানুষের মিষ্টি বিতরণের দৃশ্য দেখেই বোঝা যায়। স্থানীয়দের দাবি, সরকার ও নির্বাচন কমিশনের উচিত দ্রুত তদন্ত করে তাঁর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া।

সব মিলিয়ে শ্যামনগরের মানুষ এখন একটি সুন্দর ও কলঙ্কমুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ আশা করছে। মিষ্টি বিতরণের এই দৃশ্যটি মূলত দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। সাতক্ষীরার সাধারণ জনগণ মনে করে, আদর্শিক রাজনীতিতে পচন ধরলে তা সমাজের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়ায়। গাজী নজরুলের এই পতন অনেক নেতার জন্যই একটি বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে। এখন দেখার বিষয়, আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁর সংসদ সদস্য পদের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যায় এবং এলাকার রাজনৈতিক অস্থিরতা কত দ্রুত প্রশমিত হয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ