কবিরহাটে বেপরোয়া সিএনজির ধাক্কায় নিভে গেল কৃষকের প্রাণ: শোকাতুর নোয়াখালী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন এক নিয়মিত আতঙ্কের নাম। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও পিচঢালা পথ রঞ্জিত হচ্ছে সাধারণ মানুষের রক্তে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের কৃষক মো. সফি উল্যাহর নাম। গত সোমবার (২০ জুলাই) রাতে কবিরহাট থানার ঠিক সামনেই এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন এই ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ। ঘাতক সিএনজিচালিত অটোরিকশার প্রচণ্ড ধাক্কায় তার জীবনের প্রদীপ চিরতরে নিভে যায়। হাসপাতালের বিছানায় দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ভোররাত ৩টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় এখন শোকের মাতম চলছে। সাধারণ একজন কৃষকের এমন অকাল মৃত্যুতে স্থানীয় মানুষের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ ও বিষণ্ণতা তৈরি হয়েছে।

নিহত সফি উল্যাহ (৬০) উপজেলার জগদানন্দ গ্রামের আব্দুর রশীদের বড় ছেলে ছিলেন। পেশায় একজন পরিশ্রমী কৃষক হিসেবে এলাকায় তার বেশ সুনাম ছিল। ঘটনার দিন সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনি ব্যক্তিগত একটি জরুরি কাজে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের সঙ্গে কবিরহাট থানায় এসেছিলেন। কাজ শেষে থানা থেকে বের হয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় কবিরহাটগামী একটি দ্রুতগতির সিএনজিচালিত অটোরিকশা তাকে সজোরে চাপা দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, অটোরিকশাটির গতিবেগ এতটাই বেশি ছিল যে সফি উল্যাহ ছিটকে রাস্তার অনেকটা দূরে গিয়ে পড়েন। এতে তার মাথায় ও শরীরে মারাত্মক আঘাত লাগে। ঘটনাস্থলেই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয়।

দুর্ঘটনার সাথে সাথেই স্থানীয় লোকজন এবং থানায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তারা রক্তাক্ত অবস্থায় সফি উল্যাহকে উদ্ধার করে দ্রুত কবিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিলেও তার অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরং সময়ের সাথে সাথে তার শারীরিক অবস্থার ১০০% অবনতি হতে থাকে। চিকিৎসকরা তখন তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। পরিবারের সদস্যরা অনেক আশা নিয়ে তাকে জেলা শহরের হাসপাতালে ভর্তি করেন। কিন্তু ভাগ্য তার সহায় ছিল না। দীর্ঘ সময় অচেতন থাকার পর রাত ৩টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। একটি সুখী পরিবারের স্বপ্ন যেন কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে ০% হয়ে গেল।

এদিকে পুলিশ দুর্ঘটনার পরপরই ঘাতক সিএনজিটি জব্দ করতে সক্ষম হয়। সেই সাথে চালক মো. ইউসুফকে (২৭) আটক করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আটককৃত ইউসুফ কবিরহাট উপজেলার বাটইয়া ইউনিয়নের আশ্রাফপুর গ্রামের মনির আহম্মদের ছেলে। কবিরহাট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ইমদাদুল ইসলাম মঙ্গলবার দুপুরে বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ঘাতক চালকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। নিহতের পরিবারের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পুলিশের এই তড়িৎ পদক্ষেপকে স্থানীয়রা সাধুবাদ জানালেও তারা সড়ক নিরাপত্তায় স্থায়ী সমাধানের দাবি তুলেছেন। তারা বলছেন, থানার সামনে যেখানে পুলিশের উপস্থিত থাকার কথা, সেখানেও যদি চালকরা এমন বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালায়, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?

সফি উল্যাহর মৃত্যু কেবল একটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া নয়, এটি একটি পরিবারের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার মতো ঘটনা। তার ওপর নির্ভর করত তার পুরো পরিবার। কৃষক সফি উল্যাহর উপার্জনেই চলত তাদের সংসার। এখন তার এই চলে যাওয়াতে পরিবারটি অথৈ সাগরে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওই সড়কে সিএনজি ও অন্যান্য হালকা যানগুলো প্রায়ই ৬০ থেকে ৭০ কিমি বেগে চলাচল করে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে জনবহুল মোড়গুলোতে ট্রাফিক সিগন্যাল বা গতি নিয়ন্ত্রক না থাকায় দুর্ঘটনা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৪০% ঘটে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মতো ছোট যানগুলোর বেপরোয়া চলাচলের কারণে। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া চালকদের হাতে গাড়ির চাবি তুলে দেওয়া এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে অনেকে মনে করছেন।

এই মর্মান্তিক ঘটনার পর জগদানন্দ গ্রামে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। সফি উল্যাহর স্ত্রী ও সন্তানরা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। প্রতিবেশীরাও এই মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। তারা বলছেন, সফি উল্যাহ ছিলেন অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের মানুষ। কারো সাথে তার কোনো বিরোধ ছিল না। এমন একজন মানুষের এভাবে চলে যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। গ্রামবাসীর দাবি, ঘাতক চালকের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো চালক এভাবে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস না পায়। এছাড়া তারা কবিরহাট থানার সামনে গতিরোধক বা স্পিড ব্রেকার বসানোর জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।

নোয়াখালীর এই সড়ক দুর্ঘটনার খবরটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সচেতন নাগরিকরা বলছেন, কেবল চালককে আটক করলেই সড়কের বিশৃঙ্খলা কমবে না। এর জন্য প্রয়োজন ১০০% সঠিক ট্রাফিক আইন প্রয়োগ এবং লাইসেন্সবিহীন চালকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া। কবিরহাটের এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের এখনো অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি আর চালকদের সচেতনতাই পারে এমন করুণ মৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে। অন্যথায় আরও অনেক সফি উল্যাহকে অকালে প্রাণ দিতে হবে এবং অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়বে।

পরিশেষে বলা যায়, কবিরহাটের এই দুর্ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। সড়কের প্রতিটি বাঁকে যেন মৃত্যুর হাতছানি না থাকে, সেজন্য সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নিহত সফি উল্যাহর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করার পাশাপাশি দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। কবিরহাট থানা পুলিশ আশ্বস্ত করেছে যে, তারা এই মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে এবং নিহতের পরিবার যেন শতভাগ ন্যায়বিচার পায়, সে বিষয়ে তারা বদ্ধপরিকর। সড়ক যেন আর কারো শেষ গন্তব্য না হয় এমন প্রত্যাশাই এখন সকলের মনে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ