বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার গঠনের ঠিক পাঁচ মাস পর এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই বিশেষ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার গঠনের পর এটিই ছিল যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম আনুষ্ঠানিক বসা। প্রায় দেড় ঘণ্টার এই বৈঠকে শুধু রাজনৈতিক আলাপ নয়, বরং দীর্ঘদিনের আন্দোলনের সাথীদের মধ্যে জমে থাকা কিছু মান-অভিমান দূর করার চেষ্টাও দেখা গেছে। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী শরিক নেতাদের সম্মানে এক রাজকীয় নৈশভোজের আয়োজন করেন, যা রাজনীতির মাঠে বেশ ইতিবাচক আলোচনা তৈরি করেছে।
সূত্র জানায়, এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকার পরিচালনায় শরিক দলগুলোর পরামর্শ নেওয়া এবং জোটকে আরও শক্তিশালী করা। নির্বাচনের আগে বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা একটি ‘জাতীয় সরকার’ গঠন করবে। তবে বাস্তবে দেখা গেছে, শরিক দলগুলোর মধ্য থেকে মাত্র ৩ জন নেতাকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে জোটের ভেতরে ভেতরে কিছুটা অসন্তোষ কাজ করছিল। মূলত সেই দূরত্ব কমিয়ে আনতেই প্রধানমন্ত্রী এই উদ্যোগ নিয়েছেন। বৈঠকে উপস্থিত নেতারা খোলাখুলিভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করেন। তারা বলেন, সরকার গঠনের পর শরিকদের সঙ্গে সমন্বয় আরও বাড়ানো উচিত ছিল, যাতে জনগণের কাছে একটি ঐক্যবদ্ধ বার্তা পৌঁছায়।
বৈঠকে অংশ নেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। এছাড়া আন্দালিভ রহমান পার্থ, সাইফুল হক, রফিকুল ইসলাম বাবলু এবং শাহাদাত হোসেন সেলিমের মতো শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির পক্ষে নেতৃত্ব দেন মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নেন। তবে সব দলের উপস্থিতি ছিল না। আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি এই বৈঠক বয়কট করেছে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের মতো মৌলিক বিষয়ে ঐক্যমতে না পৌঁছে তারা এ ধরনের বৈঠকে বসবে না। এমনকি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকেও দাওয়াত দেওয়া হলেও তারা কৌশলী কারণে আসেনি।
বৈঠকের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। শরিক নেতারা অভিযোগের সুরে বলেন, গত ৫ মাসে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গতি বেশ ধীর। তারা মনে করেন, সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে বিএনপি অনেকটা ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ করছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগ বা সংরক্ষিত নারী আসনের বিষয়ে শরিকদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি। একজন নেতা তো সোজাসুজি প্রশ্ন তুলে বসেন যে, গত ৫ মাসে মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক তৎপরতা প্রায় ০% হয়ে গেছে। তাদের মতে, রাজপথের শরিকদের যদি শাসন ব্যবস্থায় ১০০% সম্পৃক্ত করা না হয়, তবে জনগণের মনে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে। এই অভিযোগগুলো তারেক রহমান অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে শোনেন এবং নোট নেন।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শরিকদের আশ্বস্ত করে বলেন, সরকার একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ শুরু করেছে। আগের সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক মন্দা এবং ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক করতে সময় লাগছে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে বেশ নাজুক এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায় ৫০% পর্যন্ত ঘাটতি ছিল যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। তিনি কৃষকদের জন্য স্বল্প সুদে কৃষিঋণ, পরিবার কার্ড এবং নতুন করে খাল খনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন। তারেক রহমান বলেন, “আমরা আন্দোলনের সময় যে ৩১ দফা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তা বাস্তবায়নে আমরা বদ্ধপরিকর। হয়তো কাজ শুরু করতে ৫ মাস দেরি হয়েছে, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য একদম পরিষ্কার।”
বৈঠকের গাম্ভীর্যের মাঝেও কিছু হাস্যরসাত্মক মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল। আলোচনার এক পর্যায়ে একজন নেতা কৌতুক করে জিজ্ঞেস করেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এই নৈশভোজ কি আমাদের জন্য ‘ফেয়ারওয়েল ডিনার’ (বিদায়ী ভোজ)?” এই প্রশ্নে পুরো ঘরে হাসির রোল পড়ে যায়। তারেক রহমান হাসিমুখে উত্তর দেন, “একেবারেই না, এটি আপনাদের জন্য একটি ‘ওয়েলকাম ডিনার’ (স্বাগত ভোজ) এবং ভবিষ্যতের এক নতুন যাত্রার শুরু।” প্রধানমন্ত্রীর এই সহজ-সরল উত্তর উপস্থিত নেতাদের অনেককে স্বস্তি দেয়। তারা বুঝতে পারেন যে, সরকার শরিকদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে না, বরং সমন্বয় আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
বৈঠক শেষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, গত ১৫-১৬ বছর ধরে যারা জেল-জুলুম সহ্য করে রাজপথে বিএনপির পাশে ছিল, তাদের সঙ্গে এই সাক্ষাৎ ছিল বেশ আবেগঘন। সরকার পরিচালনা করতে গেলে ভুলভ্রান্তি হতে পারে, তবে শরিকদের ইতিবাচক পরামর্শ আমাদের সেই পথ সংশোধনে সাহায্য করবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান আইনে দলীয় প্রতীকে ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই, তাই এ বিষয়ে ভবিষ্যতে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য যে বরাদ্দ বা পরিকল্পনা প্রয়োজন, সেখানে কোনো ঘাটতি রাখা হবে না।
সামগ্রিকভাবে, এই বৈঠকের মাধ্যমে তারেক রহমান একটি শক্তিশালী বার্তা দিলেন যে তিনি একা নয়, বরং সবাইকে নিয়েই বাংলাদেশ পুনর্গঠন করতে চান। নির্বাচনের আগে দেওয়া ‘জাতীয় সরকার’ এর যে ধারণা ছিল, তাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে তিনি ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছেন। যদিও জেএসডি বা জমিয়তের মতো কিছু দল অনুপস্থিত ছিল, তবুও বড় একটি অংশ এই আলোচনায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলোতে সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ ও রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে শরিক দলগুলোর ভূমিকা কতটুকু দৃশ্যমান হয়। রাজনীতির বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বৈঠকের মাধ্যমে বিএনপি জোটের মধ্যকার ফাটল ধরার যে গুঞ্জন ছিল, তা আপাতত অনেকটাই স্তিমিত হলো।
















