মাহিদুল ইসলাম ফরহাদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ নবাবগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আজ এক আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছিল। সোমবার (২০ জুলাই) দুপুর ১২টায় বিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ বছর প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্য অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছে। এই বিশেষ আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং বিশিষ্ট সমাজসেবক মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল। অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে এক ধরনের উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা যায়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল কৃতি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এক দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “আজকের এই ছোট ছোট শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। কেবল ভালো ফল করলেই চলবে না, প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ১০০% দেশপ্রেম এবং নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকার শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক বরাদ্দ দিচ্ছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে আমরা চেষ্টা করছি যাতে প্রতিটি বিদ্যালয় তার শতভাগ ফলাফল নিশ্চিত করতে পারে। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, নিয়মিত অধ্যয়ন আর শৃঙ্খলাই তোমাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। মেধা ও সততার সমন্বয় ঘটিয়ে তোমরা ভবিষ্যতে দেশ ও জাতির কল্যাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয়ের সুযোগ্য প্রধান শিক্ষক লতিফা হক। তিনি তার বক্তব্যে বিদ্যালয়ের সার্বিক অগ্রগতি তুলে ধরেন এবং জানান যে, গত বছরের তুলনায় এবার বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এই সাফল্যের হার আরও ১০% থেকে ২০% বৃদ্ধি পাবে। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে আকর্ষণীয় সম্মাননা স্মারক ও শুভেচ্ছা উপহার তুলে দেওয়া হয়। এই পুরস্কার প্রাপ্তির মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে যে আত্মবিশ্বাসের ছাপ দেখা গেছে, তা উপস্থিত সকলকেই মুগ্ধ করেছে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেন সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. মাহমুদুজ্জামান। তিনি বলেন, প্রাথমিক স্তরের এই সাফল্য শিক্ষার্থীদের উচ্চতর শিক্ষার সোপান হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শবনম আকতার, পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মো. তোহরুল ইসলাম সোহেল এবং সাবেক শহর শিবির সভাপতি আবু তালেব অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির আসন অলংকৃত করেন। বক্তারা প্রত্যেকেই শিক্ষার্থীদের এই অর্জনের পেছনে শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং অভিভাবকদের সচেতনতাকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তারা বলেন, একটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে বিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে ১০০% সমন্বয় থাকা জরুরি।
শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করে বক্তব্য দেন নুসরাত খানম ও আসাদুজ্জামান সাদ। নুসরাত তার বক্তব্যে বলে, “আমাদের এই অর্জনের পেছনে শিক্ষকদের অবদান অতুলনীয়। আমরা বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হতে চাই।” অভিভাবকদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন ডা. আয়েশা জুলেখা ও সিটি কলেজের প্রভাষক ফরিদা পারভীন। তারা বলেন, সন্তানদের এই সাফল্যে আমরা গর্বিত। তারা যেন আগামীতে আরও ভালো করতে পারে সেজন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহযোগিতা আমাদের সবসময় কাম্য। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. নেয়ামতুল্লাহ তার বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের নৈতিক জীবন যাপনের পরামর্শ দেন এবং অভিভাবকদের প্রতি সন্তানদের ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহারের ওপর নজর দেওয়ার অনুরোধ করেন।
অনুষ্ঠান চলাকালে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনেক অভিভাবক জানান যে, বিদ্যালয়ের এই ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মানসিকতা তৈরি করবে এবং তাদের পড়াশোনায় আরও মনোযোগী করে তুলবে। একজন অভিভাবক উল্লেখ করেন, সরকার যদি প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে আরও ৫% থেকে ১০% বাজেট বৃদ্ধি করে এবং ডিজিটাল ল্যাবগুলো আরও উন্নত করে, তবে গ্রামীণ ও শহরতলীর শিক্ষা ব্যবস্থার পার্থক্য ঘুচে যাবে। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগামী শিক্ষাবর্ষে তারা আরও নতুন নতুন শিক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তনের পরিকল্পনা করছে যাতে মেধা তালিকার শীর্ষে এই বিদ্যালয়ের নাম অক্ষুণ্ণ থাকে।
সবশেষে, একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। কৃতি শিক্ষার্থীরা তাদের পুরস্কারের ট্রফি হাতে নিয়ে সহপাঠীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। প্রধান অতিথি এমপি নূরুল ইসলাম বুলবুল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হাসিমুখে ছবি তোলেন এবং তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন। পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয় এবং উপস্থিত সকলের মাঝে এক ইতিবাচক অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে দেয়। নবাবগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই আয়োজন প্রমাণ করে যে, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ পেলে আমাদের শিশুরা যেকোনো কঠিন বাধা পেরিয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম।
















