২০২১ সালের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে আফগানিস্তানের ক্ষমতার পালাবদল পুরো বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিল। দীর্ঘ বিশ বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে তালেবানরা যখন পুনরায় কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন হয়তো এবার এই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে শান্তি ফিরে আসবে। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, অর্থাৎ ক্ষমতা বদলের প্রায় পাঁচ বছর পর, আমাদের মনে একটি বড় প্রশ্ন জাগে “শান্তি এল ও স্বস্তি এল আফগানিস্তানে কি?” সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার দিকে তাকালে এই প্রশ্নের উত্তর খুব একটা সহজ মনে হয় না। এটা ঠিক যে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হয়তো থেমেছে, কিন্তু স্বস্তি কি সত্যিই সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে? একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে দূর থেকে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করলে মনে হয়, সেখানে ‘শান্তি’ শব্দটির সংজ্ঞা বদলে গেছে।
যুদ্ধ শেষের স্বস্তি বনাম নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই
এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, আফগানিস্তানে গত দুই দশকের যে নিয়মিত গোলাগুলি, বোমা হামলা বা বিদেশি সৈন্যদের অভিযানের আতঙ্ক ছিল, তা এখন অনেকটাই কমে গেছে। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এখন আর প্রতিদিন যুদ্ধের সাইরেন বাজে না। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, মানুষের জীবনে শারীরিক নিরাপত্তার একটি সাময়িক ‘শান্তি’ এসেছে। কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়ার মানেই কি স্বস্তি? একজন সাধারণ আফগান নাগরিকের কাছে এখন সবচেয়ে বড় যুদ্ধের নাম হলো ‘বেঁচে থাকার যুদ্ধ’। সকালে ঘুম থেকে উঠে পরিবারের জন্য খাবার জুটবে কি না, সেই চিন্তাই তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। তাই বোমার শব্দ না থাকার সাময়িক শান্তি পেটের ক্ষুধার কাছে অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
নারীদের অধিকার ও শিক্ষার বর্তমান অবস্থা
একটি দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা হলো নারী। সেই নারীদের যদি ঘরবন্দি করে রাখা হয়, তবে কি সেই দেশে কোনো দিন প্রকৃত শান্তি আসতে পারে? বর্তমানে আফগানিস্তানের নারীদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি শোচনীয় ও হৃদয়বিদারক। মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নারীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না, এমনকি একা বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে কড়া নিয়ম ও বিধিনিষেধ। যে মেয়েরা একদিন স্বপ্ন দেখেছিল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা শিক্ষক হওয়ার, তাদের স্বপ্নগুলো আজ চার দেয়ালের মাঝে আটকে গুমরে কাঁদছে। নারীদের এই অবরুদ্ধ ও ভবিষ্যৎহীন জীবন প্রমাণ করে যে, আফগানিস্তানে প্রকৃত স্বস্তি এখনো অনেক দূরের পথ।
অর্থনৈতিক সংকট ও সাধারণ মানুষের হাহাকার
আফগানিস্তানের বর্তমান অর্থনীতির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বিদেশি সাহায্য, যার ওপর দেশটির অর্থনীতি প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল, তা এখন অনেকাংশেই বন্ধ। বিদেশে থাকা আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ আটকে রাখা হয়েছে। এর ফলে দেশে চরম মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব দেখা দিয়েছে। লাখ লাখ কর্মক্ষম তরুণ বেকার বসে আছেন। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে নিজেদের ঘরের ব্যবহার্য জিনিসপত্র রাস্তায় বিক্রি করে দু’মুঠো খাবার জোগাড় করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। অর্থের অভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, ফলে অনেক শিশু ও বয়স্ক মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন। পেটে ক্ষুধা আর চোখে ভবিষ্যতের অন্ধকার নিয়ে একটি দেশের মানুষ কীভাবে শান্তিতে থাকতে পারে, তা সত্যিই এক বড় প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও একঘরে হয়ে থাকার যন্ত্রণা
গত পাঁচ বছরে তালেবান সরকার বিশ্বের কোনো দেশের কাছ থেকেই আনুষ্ঠানিক ও পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। যদিও প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে কিছু বাণিজ্য চলছে, কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতির মূল স্রোত থেকে আফগানিস্তান এখনো প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকার কারণে দেশে কোনো বড় বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না, বড় কোনো উন্নয়ন প্রকল্প হচ্ছে না। একটি দেশ যখন আন্তর্জাতিক বিশ্ব থেকে এভাবে একঘরে হয়ে থাকে, তখন তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ওপর। আফগানরাও আজ সেই বিচ্ছিন্নতার অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ভোগ করছেন।
বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকারের চরম সংকোচন
শান্তি ও স্বস্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার। কিন্তু বর্তমান আফগানিস্তানে বাকস্বাধীনতা বলতে তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। সরকারের সামান্য সমালোচনা করলেই কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এবং প্রতিবাদী নারীদের কণ্ঠ কঠোরভাবে রোধ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ সারাক্ষণ এক অজানা ভয়ে ভয়ে জীবনযাপন করছেন। এমন একটি ভীতিকর পরিবেশে যেখানে মানুষের মৌলিক মানবাধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই, সেখানে ‘শান্তি’ শব্দটি কেবল একটি ফাঁকা বুলি মাত্র। ভেতর থেকে মানুষ আসলে এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মধ্যে দিন পার করছেন।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও নতুন হুমকি
যদিও তালেবানরা গোটা দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং পূর্বের মতো প্রবল যুদ্ধ নেই, তবুও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পুরোপুরি নিরঙ্কুশ বা শতভাগ নিরাপদ নয়। আইএস-কে (ISIS-K) বা ইসলামিক স্টেটের খোরাসান শাখার মতো চরমপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো এখনো আফগানিস্তানের বিভিন্ন স্থানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তারা মাঝে মাঝেই সাধারণ মানুষের ভিড়, মসজিদ বা স্কুলগুলোতে ভয়াবহ বোমা হামলা চালাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজন এখনো এক অজানা মৃত্যু আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছেন। তাই নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তার স্বস্তি আফগানরা এখনো পুরোপুরি পাননি।
তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ও দেশ ছাড়ার আকুতি
যেকোনো দেশের আসল শক্তি ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সে দেশের তরুণ প্রজন্মের ওপর। কিন্তু আফগানিস্তানের তরুণরা আজ চরম হতাশায় নিমজ্জিত। দেশে সম্মানজনক কাজের সুযোগ নেই, শিক্ষার পরিবেশ নেই, স্বাধীনভাবে নিজের মতো বাঁচার অধিকার নেই। ফলে লাখ লাখ তরুণ জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে ইউরোপ বা প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন। যাদের মেধা ও শ্রমে দেশটি নতুন করে গড়ে ওঠার কথা ছিল, তারা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন। একটি দেশের তরুণ প্রজন্ম যখন এতটা হতাশায় ভোগে এবং দেশ ছাড়তে মরিয়া হয়ে ওঠে, তখন সেই দেশে স্বস্তির সুবাতাস বইছে, এমন কথা কোনোভাবেই বলা যায় না।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ‘শান্তি এল ও স্বস্তি এল আফগানিস্তানে কি?’ এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। হ্যাঁ, বিশ বছরের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের হয়তো আপাতত অবসান হয়েছে। আকাশে আর যুদ্ধবিমানের গর্জন শোনা যায় না। কিন্তু কেবল বন্দুকের শব্দ থামলেই যে শান্তি আসে না, আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি তারই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। পেটে ক্ষুধা, অধিকারহীন বন্দী জীবন, নারীদের চাপা কান্না আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো জাতি শান্তিতে থাকতে পারে না। আফগানিস্তানে হয়তো এক ধরণের কঠোর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি এখনো আসেনি। প্রকৃত শান্তি ও স্বস্তি তখনই আসবে, যখন দেশের প্রতিটি নাগরিক নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে সমান অধিকার পাবে, দু’বেলা পেট ভরে খেতে পারবে এবং ভয়হীনভাবে স্বাধীন মতামত প্রকাশ করতে পারবে। সেই সত্যিকারের শান্তি ও স্বস্তির জন্য আফগানদের হয়তো আরও অনেক দীর্ঘ ও কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে।
















