মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এখন আর কেবল কথার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পুরোদমে যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে। গত আট রাত ধরে ইরানের বিভিন্ন অবস্থানে টানা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তবে সবশেষ হামলাটি বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, কারণ এবার যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে ইরানের একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই হামলার পরপরই পুরো মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ১০০% নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জবাবে তেহরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই; তারা প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই হঠকারী কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের ‘বিপর্যয়কর’ মূল্য চোকাতে হবে।
সংঘাতের এই চরম মুহূর্তে কূটনৈতিক সম্পর্কের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে ইরান। দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘরিবাবাদি ঘোষণা করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারকটি তারা স্থগিত করছেন। গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে এই ঐতিহাসিক স্মারক সই হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বজায় রাখা। কিন্তু ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এই স্মারকের প্রতিটি শর্ত লঙ্ঘন করেছে। এদিকে, এই সমঝোতা স্থগিত হওয়া নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত নন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিউজনেশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সোজাসুজি বলেছেন, ইরানের এই পদক্ষেপে তাঁর কিছুই যায় আসে না। ট্রাম্পের এমন অনড় অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন হয়তো এই সংঘাতকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে প্রস্তুত।
আসলে এই নতুন লড়াইয়ের বীজ বপন করা হয়েছিল পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচল পথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে। সমঝোতা স্মারকের শর্ত অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের নির্ধারিত রুটেই আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল করার কথা ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করেই সেই পথে বাগড়া দেয়। তারা জর্ডান উপকূল দিয়ে বিকল্প পথ ব্যবহারের জন্য জাহাজগুলোকে চাপ দিচ্ছিল। এই বিরোধ থেকেই মূলত উত্তেজনার শুরু। গতকালও ইরান চারটি জাহাজকে তাদের জলসীমায় বাধা দিয়েছে। এর মধ্যে দুটি জাহাজ পিছু হটলেও বাকি দুটি ‘দুর্ঘটনার’ শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এই উত্তেজনার ফলে ৫% থেকে ১০% বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
শনিবার রাতের হামলাটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের দারখোভিন অঞ্চলে নির্মাণাধীন একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমাবর্ষণ করে। যদিও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বলছে, কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ একেবারে শুরুর দিকে ছিল, তবুও পরমাণু স্থাপনায় হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে বিশ্ব সম্প্রদায়। ইরান এই হামলাকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তেহরানের আণবিক শক্তি সংস্থার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছে না। অন্যদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, তারা কেবল ইরানের সক্ষমতা কমিয়ে দিতে এবং জর্ডানে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার প্রতিশোধ নিতেই এই অভিযান চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার জবাবে ইরানও তাদের শক্তির জানান দিয়েছে। তেহরান দাবি করেছে, তারা কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা ‘আল আদিরি ক্যাম্প’ ও ‘আলী আল সালেম’ বিমানঘাঁটিতে সফলভাবে হামলা চালিয়েছে। কুয়েত সরকারও নিশ্চিত করেছে যে, তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পানি পরিশোধনাগার লক্ষ্য করে দুই দিন ধরে হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে জর্ডানের আকাশে ইরানের ড্রোন দেখা গেছে এবং দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী সেগুলো ভূপাতিত করার দাবি করেছে। যুদ্ধের এই বিস্তার কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এর আঁচ লাগছে কুয়েত, জর্ডান এবং ইরাকের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতেও।
ইরানের ভেতরেও এখন যুদ্ধের প্রস্তুতি তুঙ্গে। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শত্রুর মোকাবিলা করতে হলে এখন জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। ইরানের সামরিক কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের হামলা বন্ধ না করে, তবে পারস্য উপসাগর মার্কিন সেনাদের জন্য কবরস্থানে পরিণত হবে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের মাত্র ৫% থেকে ১০% এখন পর্যন্ত ব্যবহার করেছে। যদি তারা পূর্ণ শক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে যেতে পারে।
এই ডামাডোলের মধ্যে ইসরায়েলও নতুন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। রয়টার্সের তথ্যমতে, ইসরায়েলি বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও সামরিক সরঞ্জাম গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে ইসরায়েল সরাসরি ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছিল, তবে ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর তারা কিছুটা শান্ত ছিল। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ইসরায়েলও আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসরায়েলি সামরিক খাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দেয়, যার একটি বড় অংশ এই যুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে যুদ্ধের এই পথে হেঁটে শেষ পর্যন্ত কার লাভ হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক রস হ্যারিসন মনে করেন, ট্রাম্প হয়তো শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে জয়ী হতে চাইছেন, কিন্তু সামরিক পদক্ষেপ সবসময় উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারে না। বরং মার্কিন হামলা ইরানিদের মধ্যে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এতে ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য অর্থাৎ ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনা ১০০% ব্যর্থ হতে পারে। সাধারণ মানুষ এখন শুধু একটাই প্রার্থনা করছে মধ্যপ্রাচ্য যেন আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী ধ্বংসযজ্ঞের দিকে না যায়। কিন্তু পরিস্থিতির যে মোড়, তাতে শান্তির আশা দিন দিন ফিকে হয়ে আসছে।
















