স্ত্রী-সন্তানকে আগুনের মুখ থেকে ফিরিয়ে এনে নিজেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে: নিউইয়র্কে প্রবাসী সোহাগের করুণ মৃত্যু

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

প্রবাসের মাটিতে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে স্ত্রী আর দুই সন্তানকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে গেলেন এক লড়াকু বাবা। গত ২১ দিন ধরে যমে-মানুষে টানাটানি চলছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হার মানতে হলো তাকে। নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে দীর্ঘ তিন সপ্তাহ আইসিইউতে (ICU) লড়াই করার পর শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৫৫ মিনিটে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন নোয়াখালীর সন্তান রফিকুল ইসলাম সোহাগ (৪৭)। অগ্নিকাণ্ডের সময় নিজের শরীরের মায়া ত্যাগ করে পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করতে গিয়ে তিনি মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়েছিলেন। তার এই আত্মত্যাগ নিউইয়র্কসহ পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটিতে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।

ঘটনাটি ঘটেছিল গত ২৬ জুন ভোর সোয়া চারটার দিকে। নিউইয়র্কের কুইন্স এলাকার জ্যামাইকার ১৭২-১২ ৯১ অ্যাভিনিউতে একটি দোতলা বাড়ির বেজমেন্টে সপরিবারে বাস করতেন সোহাগ। ওই দিন ভোর ৪টা ১৫ মিনিটে হঠাৎ করেই পুরো বেজমেন্টে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। আগুনের প্রচণ্ড উত্তাপ আর ধোঁয়ায় যখন দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম, তখন সোহাগ প্রথমে কোনোমতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন, তার স্ত্রী ঝরনা আক্তার এবং দুই আদুরে সন্তান জিহাদ ও জুবায়ের ভেতরে আটকা পড়ে আছে। যে পথ দিয়ে তিনি বের হয়েছিলেন, ততক্ষণে সেই পথ আগুনের লেলিহান শিখায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

নিজের প্রাণের মায়া না করে সোহাগ আবার আগুনের দিকে ছুটে যান। প্রধান দরজা দিয়ে ঢোকা অসম্ভব দেখে তিনি বাইরে থেকে একমাত্র জানালাটি ভেঙে ভেতরে হাত বাড়িয়ে দেন। একে একে স্ত্রী আর দুই ছেলেকে জানালার সরু পথ দিয়ে টেনে বাইরে বের করে আনেন তিনি। স্ত্রী-সন্তানরা প্রাণে বেঁচে গেলেও ততক্ষণে সোহাগের শরীরের প্রায় ৮০% থেকে ৯০% অংশ আগুনের তাপে ঝলসে যায়। মুহূর্তের মধ্যে সব আনন্দ বিষাদে রূপ নেয়। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে নিউইয়র্ক সিটি ফায়ার ডিপার্টমেন্টের (FDNY) অন্তত ২১টি ইউনিট। মোট ৭৯ জন দক্ষ ফায়ার ফাইটার ও জরুরি চিকিৎসাসেবা কর্মী আধা ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।

সোহাগের মামাতো ভাই মোহাম্মদ ফয়েজ চোখের জল মুছতে মুছতে জানান, তাদের পরিবারটি মাত্র ৭-৮ মাস আগে বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা এসেছিল। নতুন দেশে অনেক স্বপ্ন নিয়ে তারা এই বেজমেন্টে থাকা শুরু করেছিলেন। ফয়েজ ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘বেজমেন্ট থেকে বের হওয়ার পথ ছিল মাত্র একটি। সেখানে কোনো ফায়ার অ্যালার্মও ছিল না। যদি একটা অ্যালার্ম থাকত, তবে হয়তো এই দুর্ঘটনাটি ১০০% এড়ানো যেত।’ তিনি আরও জানান, সোহাগ একজন সাধারণ সাইকেল ডেলিভারিম্যান ছিলেন। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তিনি সামান্য কিছু ডলার ($) আয় করতেন, যা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলত।

নিউইয়র্ক ফায়ার ডিপার্টমেন্টের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল সম্ভবত ই-বাইকের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি থেকে। সোহাগ তার ডেলিভারি কাজের জন্য ব্যবহৃত সাইকেলের ব্যাটারিটি প্রতিদিন রাতে ঘরে চার্জে দিয়ে ঘুমাতেন। ওই দিনও ব্যাটারিটি চার্জে ছিল এবং সেখান থেকেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলে পোড়া অবস্থায় লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির অবশিষ্টাংশ খুঁজে পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে গত কয়েক বছরে এ ধরনের ব্যাটারি থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রায় ৩০% বেড়েছে, যা এখন প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য এক নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সোহাগের পারিবারিক বন্ধু জাহাঙ্গীর আলম জানান, সোহাগ ছিলেন খুবই সহজ-সরল এবং কর্মঠ একজন মানুষ। পরিবারকে একটু ভালো রাখার আশায় তিনি দিনরাত এক করে কাজ করতেন। তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী এলাকায়। প্রবাসের এই অনিশ্চিত জীবনে সন্তানদের মানুষ করাই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য। জাহাঙ্গীর বলেন, ‘সোহাগ ভাই নিজের কথা ভাবেননি। তিনি জানতেন ভেতরে গেলে তিনি দগ্ধ হতে পারেন, তবুও একজন বাবা হিসেবে তিনি সন্তানদের ছেড়ে পালিয়ে আসেননি।’ হাসপাতালের বারান্দায় সোহাগের স্ত্রীর আহাজারি দেখে উপস্থিত সবার চোখের কোণ ভিজে উঠেছে।

শনিবার ব্রুকলিনের চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড এলাকার জনপ্রিয় বাইতুল মামুন মসজিদে জোহরের নামাজের পর সোহাগের জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর তার মরদেহ নিউ জার্সিতে একটি মুসলিম কবরস্থানে দাফন করা হবে। বর্তমানে নিউইয়র্কে একটি সাধারণ জানাজা ও দাফনের খরচ প্রায় ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ ডলারের ($) বেশি। কমিউনিটির মানুষ এবং তার পরিচিতরা মিলে সেই খরচের টাকা জোগাড় করার চেষ্টা করছেন। সোহাগের অকাল মৃত্যুতে তার দুই অবুঝ সন্তানের ভবিষ্যৎ এখন ঘোর অন্ধকারের মুখে।

নিজে পুড়ে কয়লা হয়েও যারা বেঁচে থাকার আলো ছড়িয়ে দিয়ে যান, তারা হয়তো এভাবেই ইতিহাসের পাতায় বীর হয়ে থাকেন। সোহাগের এই বীরত্বপূর্ণ কাহিনী এখন সবার মুখে মুখে। তবে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি এখন সচেতন হচ্ছে বেজমেন্টে থাকা এবং ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ঝুঁকির বিষয়ে। তারা দাবি তুলছেন, প্রতিটি বাসাবাড়িতে যেন অন্তত ১০০% কার্যকর ফায়ার অ্যালার্ম নিশ্চিত করা হয়। সোহাগ হয়তো আর ফিরে আসবেন না, কিন্তু তার এই মহান আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়ে গেল সন্তানদের বিপদে একজন বাবা কীভাবে নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে এগিয়ে যেতে পারেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ