প্রবাসীদের জন্য সরকারের বিশেষ উপহার ‘প্রবাসী কার্ড’: এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ থেকে শুরু করে সস্তায় চিকিৎসা-মিলবে সব সুবিধা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য এক বিশাল সুখবর নিয়ে এসেছে সরকার। যারা বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান, তাদের সামাজিক মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে সরকার ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। প্রথম পর্যায়ে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ এক ধরনের ‘ডেবিট কার্ড’ ইস্যু করা হবে। শনিবার (১৮ জুলাই) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সভা শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন গণমাধ্যমকে এই চমৎকার উদ্যোগের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে লাখ লাখ প্রবাসীর দীর্ঘদিনের চাওয়া পূরণ হতে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় জানানো হয়, বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী অঙ্গীকার পালনে ১০০% প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইতিমধ্যে সরকার কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও ক্রীড়া কার্ড সফলভাবে চালু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার প্রবাসীদের জন্য বিশেষ এই কার্ডটি চালু হতে যাচ্ছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো প্রবাসীদের ক্ষমতায়ন, আর্থিক প্রণোদনা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সুবিধাকে তাদের হাতের নাগালে পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে ‘ডুয়াল কারেন্সি কার্ডের’ মাধ্যমে প্রবাসীরা এখন সরাসরি ইন্টারন্যাশনাল পেমেন্ট করতে পারবেন, যা তাদের লেনদেনের কষ্ট ও ঝুঁকি অন্তত ৮০% কমিয়ে দেবে।

প্রবাসী কার্ডের সুবিধার তালিকাটি বেশ দীর্ঘ এবং আকর্ষণীয়। এই কার্ডধারী প্রবাসীরা দেশ-বিদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে ‘কমপ্লিমেন্টারি এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ’ ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। এছাড়া বিমানবন্দরে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার ভোগান্তি কমাতে তাদের জন্য থাকবে বিশেষ ইমিগ্রেশন বুথ। বিমানবন্দরের ভেতরেই তাদের জন্য ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ সেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, উড়োজাহাজের টিকিট কেনা এবং হোটেল বুকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রবাসীরা ১০% থেকে ৩০% পর্যন্ত বিশেষ ডিসকাউন্ট বা ছাড় পাবেন। এছাড়া দেশে ফেরার পর সিগনেচার কার্ডধারী প্রবাসীদের জন্য এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি পৌঁছাতে ‘পিক অ্যান্ড ড্রপ’ সেবার পাশাপাশি ন্যায্যমূল্যে গাড়ি বুকিংয়ের সুবিধাও থাকবে।

চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রেও এই কার্ডটি হবে এক অনন্য রক্ষাকবচ। সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রবাসীদের জন্য থাকবে আলাদা ‘সেবা বুথ’, যেখানে তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা পাবেন। এছাড়া দেশের বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এই কার্ড প্রদর্শন করলে ল্যাব টেস্ট বা শয্যা ভাড়ায় বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে। সবচেয়ে আবেগপ্রবণ বিষয়টি হলো, কোনো কার্ডধারী প্রবাসী বিদেশে মারা গেলে তার মরদেহ সরকারি খরচে দেশে আনা হবে। এছাড়া প্রবাস ফেরত ব্যক্তিদের নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে পুনর্বাসন সহায়তা এবং বিমা সুবিধা প্রদান করা হবে। জমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ কিংবা বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও কার্ডধারীরা বিশেষ অগ্রাধিকার পাবেন। সরকারের এই উদ্যোগটি প্রবাসীদের মনে নিরাপত্তার এক বিশাল ভরসা তৈরি করবে।

আর্থিক সুবিধার কথা মাথায় রেখে কার্ডটিতে যুক্ত করা হয়েছে ‘রেমিট্যান্স রিওয়ার্ড পয়েন্ট’। অর্থাৎ একজন প্রবাসী যত বেশি রেমিট্যান্স পাঠাবেন, তার কার্ডে তত বেশি পয়েন্ট জমা হবে। এই পয়েন্ট ব্যবহার করে পরবর্তীতে বিভিন্ন কেনাকাটা বা সেবায় ছাড় পাওয়া যাবে। ব্যাংকিং ক্ষেত্রে তাদের ‘ক্রেডিট স্কোরিং’ উন্নত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যার ফলে প্রবাসীরা খুব সহজেই ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নিতে পারবেন। এনআইডি (NID), পাসপোর্ট এবং কনস্যুলার সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে না; কার্ড দেখালেই তারা লাইনের সবার আগে সেবা পাবেন। এটি প্রবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রের সম্মান প্রদর্শনের একটি বড় মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।

কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্ড বিতরণ শুরু হবে। সরকার একটি বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে; চলতি ডিসেম্বর মাসের মধ্যে অন্তত ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) প্রবাসীর হাতে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। এরপর আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ২,০০,০০০ (দুই লাখ) করার টার্গেট নেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে কাজ শুরু হলেও দ্বিতীয় পর্যায়ে ‘প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক’ পুরো প্রকল্পের দায়িত্ব বুঝে নেবে। প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা এই সেবার আওতায় আসতে পারেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভায় জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (NSDA) আরও আধুনিক ও সময়োপযোগী করার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের শ্রমিকরা যেন বিদেশে গিয়ে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে বেশি বেতন পান, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দক্ষ হয়ে বিদেশে গেলে তাদের আয় বর্তমানের চেয়ে ৫০% থেকে ৬০% পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। বৈঠকে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক তাদের নিজ নিজ দপ্তরের প্রস্তুতির কথা তুলে ধরেন। তারা বিশ্বাস করেন, এই কার্ড চালুর ফলে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর প্রবণতা অনেক কমে যাবে এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ অন্তত ২০% বৃদ্ধি পাবে।

বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ ও মাহদী আমিন, প্রবাসী কল্যাণ সচিব মোখতার আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান এবং বিএমইটি-এর মহাপরিচালক জামিল আহমেদসহ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এই উদ্যোগটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রবাসীরা বিদেশের মাটিতে নিজেদের আরও বেশি শক্তিশালী ও গর্বিত নাগরিক হিসেবে অনুভব করবেন। এটি কেবল একটি প্লাস্টিক কার্ড নয়, বরং এটি দেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের অসামান্য অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে নেওয়ায় সারা বিশ্বের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এখন খুশির আমেজ বিরাজ করছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ