যশোরে জাঁকজমকপূর্ণ বৃক্ষমেলা ২০২৬ শুরু: সবুজে সাজানোর শপথ নিলেন হাজারো দর্শনার্থী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মালিকুজ্জামান কাকা, যশোর:

যশোরের ঐতিহাসিক টাউন হল ময়দান এখন সবুজে সবুজে ছেয়ে গেছে। চারিদিকে থরে থরে সাজানো নানা প্রজাতির গাছের চারা। ‘পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ করি, সবুজ বাংলাদেশ গড়ি’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে যশোরে শুরু হয়েছে সপ্তাহব্যাপী বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষ মেলা-২০২৬। শনিবার (১৮ জুলাই) সকালে জেলা প্রশাসন ও সামাজিক বন বিভাগ, যশোরের যৌথ আয়োজনে এই মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। সকাল থেকেই শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন এলাকা থেকে গাছপ্রেমী মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করেন মেলা প্রাঙ্গণে। গ্রীষ্মের তপ্ত আবহাওয়ার মাঝেও কচি পাতার সতেজতা আর ফুলের সুবাস দর্শনার্থীদের মনে অন্যরকম এক প্রশান্তি বিলিয়ে দিচ্ছে। আয়োজকরা আশা করছেন, এবারের মেলায় চারা বিক্রির পরিমাণ গত বছরের তুলনায় অন্তত ২০% থেকে ২৫% বৃদ্ধি পাবে।

মেলার উদ্বোধন করেন যশোরের জেলা প্রশাসক মোঃ আশেক হাসান। তিনি ফিতা কেটে এবং আকাশে রঙিন বেলুন উড়িয়ে মেলার শুভ সূচনা ঘোষণা করেন। উদ্বোধন শেষে এক বর্ণাঢ্য র‍্যালি মেলা প্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম। এছাড়া জেলা পরিষদের প্রশাসক, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন এবং জেলা বিএনপির সভাপতি এডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ মেলায় উপস্থিত ছিলেন। অতিথিরা মেলার প্রতিটি স্টল ঘুরে দেখেন এবং বিভিন্ন দুর্লভ প্রজাতির গাছের খোঁজখবর নেন। বন বিভাগের তথ্যমতে, এবারের মেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩৫টি নার্সারি তাদের স্টল সাজিয়েছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোঃ আশেক হাসান বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে বৃক্ষরোপণ এখন আর কেবল বিলাসিতা নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। একটি গাছ আমাদের বিনামূল্যে অক্সিজেন দেয় এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, একটি আদর্শ দেশের মোট আয়তনের অন্তত ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন, কিন্তু আমাদের দেশে তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। তাই প্রতিটি নাগরিককে বছরে অন্তত ২ থেকে ৩টি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানান তিনি। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি একটি সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করেন:
‘বৃক্ষ রোপন আয়োজনে শিশু কিশোরী যুবক
নিশ্চয় সবুজে মায়া মমতা ভালোবাসা ঝোঁক
গাছ পরিচর্যায় সঠিক আদুরে বাঙালি চোখ।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, শুধু গাছ লাগালেই হবে না, সেটিকে সন্তানের মতো পরম মমতায় বড় করে তুলতে হবে।

মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম ও মাল্টার মতো দেশি ফলজ গাছ। তবে থাই পেয়ারা, ড্রাগন ফল, অ্যাভোকাডো এবং জাপানি পার্সিমনের মতো বিদেশি ফলদ চারার চাহিদাও এবার তুঙ্গে। নার্সারি মালিকরা জানান, গত কয়েক বছরে ড্রাগন ও মাল্টার চাষাবাদ বাড়ির ছাদে বা আঙিনায় প্রায় ৪০% বেড়ে গেছে। চারার দামও রাখা হয়েছে সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে। ৫০ টাকা থেকে শুরু করে দুর্লভ বনসাই বা বিরল প্রজাতির ক্যাকটাস পাওয়া যাচ্ছে ৫,০০০ টাকা থেকে ১০,০০০ টাকার মধ্যে। এছাড়া চন্দন, আগর, সেগুন ও মেহগনির মতো মূল্যবান বনজ গাছের চারাও সংগ্রহ করছেন অনেকে। পরিবেশ সচেতন মানুষেরা এখন ফুলের চেয়ে ফলদ ও ঔষধি গাছের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।

মেলার অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ছিল স্থানীয় বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে চারা বিতরণ। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার নিজ হাতে কয়েকশ শিক্ষার্থীর হাতে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ ও বনজ চারা তুলে দেন। চারা হাতে পেয়ে শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে ছিল উপচে পড়া আনন্দ। দশম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী জানায়, “আমি আজকে একটি আম ও একটি নিম গাছের চারা পেয়েছি। আমি এগুলো আমার বাড়ির উঠানে লাগাব এবং প্রতিদিন যত্ন নেব।” আয়োজকরা জানান, মেলা চলাকালীন সময়ে অন্তত ২,০০০ চারা বিনামূল্যে বিতরণ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এই উদ্যোগের ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশ রক্ষায় গাছ লাগানোর প্রবণতা অন্তত ৯০% বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মেলার স্টল মালিকরা জানান, বর্তমান সময়ে মানুষ রাসায়নিক সারের চেয়ে জৈব সারের দিকে বেশি ঝুঁকছে। তাই স্টলগুলোতে গাছের পাশাপাশি ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সারও বিক্রি হচ্ছে। ড্রাগন ফল বা মাল্টার চারার সঠিক পরিচর্যা কীভাবে করতে হয়, তা নিয়ে দর্শনার্থীদের বিনামূল্যে পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। এক দর্শনার্থী জানান, “আমি প্রতি বছরই এই মেলা থেকে গাছ কিনি। এবার ৫টি ড্রাগন আর ৩টি লিচুর চারা কিনলাম। মেলায় এলে একই ছাদের নিচে অনেক জাতের গাছ পাওয়া যায়, যা নার্সারিতে গিয়ে খুঁজে পাওয়া কঠিন।” মেলার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে গাছ লাগানোর যে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে যশোরের পরিবেশের জন্য বড় আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াবে।

সপ্তাহব্যাপী এই বৃক্ষ মেলা আগামী সাত দিন প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। মেলা প্রাঙ্গণে নিরাপত্তার জন্য পুলিশের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় মেলা মঞ্চে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বন বিভাগ জানিয়েছে, এবারের মেলার মূল লক্ষ্য কেবল গাছ বিক্রি নয়, বরং মানুষকে পরিবেশ সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করা। যদি প্রতিটি পরিবার অন্তত একটি করে গাছ রোপণ করে, তবে আগামী ৫ বছরে দেশের সবুজায়নের হার ১৫% থেকে ২০% বাড়ানো সম্ভব। যশোরের এই বৃক্ষ মেলা তাই কেবল একটি আয়োজন নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

পরিশেষে, যশোরের এই বৃক্ষরোপণ অভিযান ও মেলা পরিবেশ রক্ষায় এক অনন্য মাইলফলক। জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের এই মহতী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন যশোরের সুধী সমাজ। তাদের মতে, যশোরের আনাচে-কানাচে যেভাবে নগরায়ণ বাড়ছে, তাতে এই ধরনের মেলা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মেলার শেষ দিনে সেরা নার্সারি মালিকদের মাঝে বিশেষ পুরস্কার ও সম্মাননা প্রদান করা হবে। যশোরের এই উৎসবমুখর পরিবেশ যেন প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশ আবারও একটি সবুজ ও শীতল দেশে পরিণত হয় এমনটাই প্রত্যাশা করছেন মেলায় আসা হাজারো দর্শনার্থী।

সম্পর্কিত নিবন্ধ