আগামী স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিতে নেত্রকোনায় জামায়াতের বিশাল কর্মশালা: ৮৬ ইউনিয়ন ও ৫ পৌরসভার প্রার্থীদের রণকৌশল নির্ধারণ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

নেত্রকোণা প্রতিনিধি:

নেত্রকোনা জেলায় বইছে আগাম নির্বাচনী হাওয়া। জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি এখন স্থানীয় সরকারের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে সরগরম হয়ে উঠেছে মাঠপর্যায়। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন ও বিজয় সুনিশ্চিত করতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এরই অংশ হিসেবে নেত্রকোনা জেলার সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও মেয়র প্রার্থীদের নিয়ে এক দিনব্যাপী বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছে জেলা জামায়াত। শনিবার (১৮ জুলাই) সকাল ৯টায় জেলা প্রেসক্লাবের হল রুমে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই কর্মশালা শুরু হয়। দিনভর চলা এই আয়োজনে প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনী এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি এবং জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

কর্মশালার উদ্বোধন করেন জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক ছাদেক আহমেদ হারিছ। তিনি তার উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, “জনগণ এখন সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের খোঁজ করছে। আমরা চাই আমাদের প্রার্থীরা প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় গিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করুক। এবারের নির্বাচনে আমরা ১০০% স্বচ্ছতা ও সততার সাথে লড়াই করতে চাই।” উদ্বোধনের পর থেকেই শুরু হয় মূল প্রশিক্ষণ পর্ব, যেখানে প্রার্থীরা একে একে তাদের নিজ নিজ এলাকার ভোটারদের চাওয়া-পাওয়া এবং স্থানীয় সমস্যাগুলোর কথা তুলে ধরেন। জেলার ১০টি উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এই প্রার্থীরা আসন্ন লড়াইয়ে জেতার ব্যাপারে বেশ আশাবাদী।

এবারের এই কর্মশালায় নেত্রকোনা জেলার মোট ৮৬টি ইউনিয়ন থেকে দল মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী এবং ৫টি পৌরসভার ৫ জন মেয়র প্রার্থী সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। অর্থাৎ মোট ৯১ জন শীর্ষ স্থানীয় প্রার্থী এই প্রশিক্ষণে উপস্থিত ছিলেন। আয়োজকরা জানান, প্রতিটি প্রার্থীকে তাদের এলাকার অন্তত ৯০% ভোটারের কাছে ব্যক্তিগতভাবে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। প্রার্থীরাও জানান, গত কয়েক বছরে এলাকার রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে সামাজিক অস্থিরতা প্রায় ৩০% থেকে ৪০% বেড়েছে, যা নিরসনে তারা বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। জনগণের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে সেবা পৌঁছে দেওয়াই হবে তাদের মূল লক্ষ্য।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ আব্দুর রব। তিনি প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, “নির্বাচনে জিততে হলে শুধু দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আপনার এলাকায় যে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির আছে কিংবা বড় মসজিদ আছে, সেখানকার মানুষের সাথেও সুসম্পর্ক রাখতে হবে। এলাকার ব্যবসায়ী, শিক্ষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে নিয়মিত মতবিনিময় করতে হবে। অন্তত ৬০% থেকে ৭০% সাধারণ ভোটারের সমর্থন পেতে হলে আপনাকে আগে একজন ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিতি পেতে হবে।” তিনি আরও জানান, নির্বাচনের সময় অর্থের লেনদেন নিয়ে কোনো রকম অস্বচ্ছতা বরদাশত করা হবে না।

কর্মশালায় আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিয়ে বিশেষ একটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রার্থীদের বলা হয়, নির্বাচনী প্রচারণায় যে টাকা খরচ হবে, তার অন্তত ৮০% যেন বৈধ উৎস থেকে আসে এবং প্রতিটি খরচের হিসাব যেন নির্ভুল থাকে। এছাড়া প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা এবং ব্যক্তিগত জীবনের ছোটখাটো বিবাদ মিটিয়ে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, সাধারণ মানুষ যখন দেখবে একজন প্রার্থী তার প্রতিবেশীর বিপদে সবার আগে এগিয়ে আসছে, তখন তার প্রতি মানুষের আস্থা অন্তত ৫০% বেড়ে যাবে। এই সামাজিক পুঁজিই হবে নির্বাচনে জয়ের প্রধান হাতিয়ার।

বিশেষ এই কর্মশালায় আরও বক্তব্য রাখেন জেলা নায়েবে আমীর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান ও জেলা কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা রুহুল আমিন। এছাড়া নেত্রকোনার প্রতিটি উপজেলার আমীর ও সেক্রেটারিগণ নিজ নিজ এলাকার প্রার্থীদের নিয়ে পৃথক ছোট ছোট বৈঠক করেন। তারা মাঠপর্যায়ে ইউনিট সংগঠনের সাথে প্রার্থীদের সমন্বয় করার নির্দেশ দেন। তারা বলেন, যদি ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা প্রার্থীর হয়ে জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করেন, তবে জয়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি বেড়ে যায়। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী মাস থেকেই প্রার্থীরা তাদের গণসংযোগ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেবেন।

দিনব্যাপী এই কর্মশালায় প্রার্থীরা স্থানীয় নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। কেউ কেউ বলেন, তাদের এলাকায় শিক্ষিত বেকার যুবকদের সংখ্যা ২৫% এর বেশি, যারা কাজের আশায় কর্মসংস্থানের দাবি তুলছেন। প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দেন যে, তারা নির্বাচিত হতে পারলে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন। এছাড়া মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করার ঘোষণাও দেন তারা। প্রার্থীদের এই দৃঢ় প্রত্যয় দেখে মনে হচ্ছে, নেত্রকোনায় এবারের স্থানীয় নির্বাচন বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে।

বিকেল নাগাদ সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে কর্মশালার সমাপ্তি ঘটে। প্রশিক্ষণ শেষে প্রার্থীরা বেশ উজ্জীবিত হয়ে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যান। তারা জানান, এই কর্মশালা থেকে তারা যে কৌশলগুলো শিখেছেন, তা মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করলে জয় পাওয়া অনেক সহজ হবে। জেলা জামায়াতের এই আগাম প্রস্তুতি অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাধারণ ভোটারদের ধারণা, জামায়াতের এই সুসংগঠিত প্রস্তুতি আসন্ন নির্বাচনে ভোটের সমীকরণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ