অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হওয়া মার্কিন চুক্তিকে ‘দেশবিরোধী’ বললেন নুরুল হক: জুলাই আন্দোলনে বিদেশি শক্তির প্রভাব নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘অনির্বাচিত’ উল্লেখ করে ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তিকে দেশের স্বার্থবিরোধী বলে কড়া সমালোচনা করেছেন প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ও গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনের আগে করা সেই বিতর্কিত চুক্তির দায় বর্তমান সরকারের ওপর চাপানো কোনোভাবেই ঠিক হবে না। শুক্রবার (১৭ জুলাই) রাজধানীর ব্যস্ততম যাত্রাবাড়ী মোড়ে ‘১৭ জুলাই যাত্রাবাড়ী প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। যাত্রাবাড়ী প্রতিরোধ দিবস বাস্তবায়ন কমিটি এই সভার আয়োজন করে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা সেই চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে নুরুল হক বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে, ওই অন্তর্বর্তী সরকার ছিল একটি অনির্বাচিত সরকার। তারা কীভাবে জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া নির্বাচনের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এমন একটি চুক্তি সই করল? সেই চুক্তির ধারাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেগুলো আমাদের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজকাল বিভিন্ন টেলিভিশন টকশো বা সেমিনারে এই চুক্তির জন্য বিএনপিকে দায়ী করার একটা অপচেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু সত্যটা হলো, ওই চুক্তি তো করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। যাদের আপনারা জুলাই বিপ্লবের তথাকথিত নায়ক বানিয়েছিলেন, মূলত তাদের সম্মতিতেই এই স্বার্থবিরোধী কাজগুলো হয়েছে।’

নুরুল হক তার বক্তব্যে নির্বাচনের আগের সময়কার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে ফেসবুক-ইউটিউব ব্যবহার করে এক ধরনের ‘কৃত্রিম জনমত’ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল। এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছে। তিনি মনে করেন, ১০০% স্বচ্ছতা না থাকলে গণতন্ত্র টেকসই হয় না। এই ধরনের অপপ্রচার ও ডিজিটাল কারসাজি রোধে ছাত্র সংগঠনগুলোকে আরও সচেতন ও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, গোপন রাজনৈতিক তৎপরতা বাদ দিয়ে প্রকাশ্য রাজপথের স্বচ্ছ রাজনীতিই দেশের জন্য কল্যাণকর।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংস্কার নিয়ে নুরুল হক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শের প্রতিফলন দেখতে পাই। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।’ তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, আগামী ৫ বছরে তারেক রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের এক নতুন শিখরে পৌঁছাবে। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পথ হলো সংসদীয় কমিটি এবং খোলামেলা সংলাপ। রাজপথে হুমকি-ধমকি দিয়ে বা আন্দোলনের উসকানি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে নুরুল হক বলেন, এটি ছিল দলমত নির্বিশেষে ছাত্র-জনতার এক বিশাল ত্যাগের ফসল। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, জুলাই আন্দোলনকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের ‘একক বয়ান’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা ঠিক হবে না। যেমনটা অতীতে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের বয়ান নিয়ে করেছিল। নুরুল হকের মতে, এই আন্দোলনে সাধারণ মানুষ এবং কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অনন্য। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে যেভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে নুরুল হক জুলাই আন্দোলনের শেষ দিকের পরিস্থিতি নিয়ে এক বিস্ফোরক দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের শেষ দিকে আমরা স্পষ্ট বিদেশি শক্তির প্রভাব লক্ষ্য করেছি। কিছু ছাত্র নেতাকে সরাসরি বিদেশি অপশক্তি নিয়ন্ত্রণ করছিল। আন্দোলনের পরিচিত কিছু মুখকে ব্যবহার করে অন্তর্বর্তী সরকারকে নিজেদের স্বার্থে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিল সেই শক্তিগুলো।’ তিনি মনে করেন, এই ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং এ বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ সমাধান প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে চলা আন্দোলন প্রসঙ্গে ডাকসুর সাবেক এই ভিপি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে যৌক্তিক দাবি থাকলেও কিছু মহল রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এসব আন্দোলনকে উসকে দিচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আন্দোলনের নামে যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়, তবে স্বৈরাচারপন্থী পুরনো শক্তিগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পাবে।’ তাই সবাইকে হুজুগে না মেতে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার পথে আসার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি জামায়াত-শিবিরের অবদানের কথা স্বীকার করলেও অতীতের কিছু ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন এবং নতুন প্রজন্মকে স্বাধীন রাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এছাড়া আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলামসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। বক্তারা সবাই জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং দেশের গণতান্ত্রিক ধারা সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার করেন। সভার শেষে নুরুল হক আবারও জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো মূল্যে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে হবে এবং বিদেশি প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ