জ্বালানি আর তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা: কুয়েতের সাথে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তির পথে পাকিস্তান

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

পাকিস্তানের অর্থনীতি এখন এক চরম ক্রান্তিকাল পার করছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসলামাবাদের জন্য এখন জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পাকিস্তান সরকার এখন এক অভিনব কৌশল হাতে নিয়েছে। তারা তাদের সামরিক দক্ষতাকে পুঁজি করে মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশ কুয়েতের কাছ থেকে বড় ধরনের বিনিয়োগ আর জ্বালানি সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। খবরটি রয়টার্স মারফত জানা গেছে, যেখানে পাঁচটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, পাকিস্তান ও কুয়েতের মধ্যে একটি ‘বর্ধিত প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নিয়ে পর্দার আড়ালে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, পাকিস্তান কুয়েতকে সামরিক সুরক্ষা এবং আধুনিক সমরাস্ত্র দেবে, আর তার বিনিময়ে কুয়েত পাকিস্তানে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এবং সস্তায় বা দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে জ্বালানি তেল সরবরাহ করবে। তবে এই আলোচনাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনীতি, বিশেষ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনার কারণে এই চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা পাকিস্তানের জন্য বেশ জটিল হতে পারে। কারণ, কুয়েতকে নিরাপত্তা দেওয়ার অর্থ হলো ওই অঞ্চলে ইরানের প্রভাবের বিপরীতে অবস্থান নেওয়া, যা ইসলামাবাদের জন্য বড় এক কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

কুয়েত কেন হঠাত পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে? এর পেছনে রয়েছে গত কয়েক বছরের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা। কুয়েত নিজেও বেশ কয়েকবার ড্রোন হামলা এবং ছোটখাটো নাশকতার শিকার হয়েছে। তারা দেখছে যে, আগের মতো মার্কিন সুরক্ষার ওপর ১০০% ভরসা করা এখন আর সম্ভব নয়। ট্রাম্প বা বাইডেন প্রশাসনের আমল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত মার্কিনিরা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা থেকে নিজেদের কিছুটা গুটিয়ে নিচ্ছে। এই শূন্যস্থান পূরণ করতে কুয়েত এখন পাকিস্তানের বিশাল সামরিক বাহিনী এবং তাদের তৈরি করা উন্নতমানের ড্রোনের দিকে নজর দিচ্ছে। কুয়েত চাইছে পাকিস্তানের হাজার হাজার সেনা তাদের মাটিতে মোতায়েন থাকুক এবং তারা একটি শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে দিক।

পাকিস্তানের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ হলেও এর পেছনে অনেক ঝুঁকি আছে। ২০২৩ সালে সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তান একটি একই ধরনের চুক্তি করেছিল। সেই চুক্তিতে বলা ছিল, সৌদির ওপর কোনো হামলা হলে পাকিস্তান তাকে নিজেদের ওপর হামলা হিসেবে দেখবে। গত সোমবার ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা যখন সৌদি আরবে হামলা চালায়, তখন থেকেই ইসলামাবাদে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ, এই চুক্তির কারণে পাকিস্তান হয়তো না চাইতেও ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের ছায়া যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। এখন কুয়েতের সাথেও একই রকম চুক্তি হলে পাকিস্তান আসলে মধ্যপ্রাচ্যের রণাঙ্গনের খুব কাছে চলে যাবে।

তবে পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের কাছে এখন দেশের অর্থনীতি বাঁচানোই প্রধান লক্ষ্য। জ্বালানি মন্ত্রণালয় চাইছে দেশে তেলের এক বিশাল মজুত বা ‘বন্ডেড ফুয়েল স্টোরেজ’ তৈরি করতে। কুয়েত এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে ডিজেল সরবরাহের একটি চুক্তি আগে থেকেই আছে। নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি হলে কুয়েত থেকে পাকিস্তান আরও বেশি পরিমাণে অপরিশোধিত তেল এবং এলএনজি আমদানির সুবিধা পাবে। এছাড়া পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এখন আর কেবল ব্রিটিশ বা আমেরিকান অস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে না, তারা নিজেরাই এখন আধুনিক ড্রোন এবং যুদ্ধবিমান তৈরি করছে। এই সরঞ্জামগুলো কুয়েতকে দেওয়ার মাধ্যমে কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় করার সুযোগ দেখছে পাকিস্তান।

মধ্যপ্রাচ্যের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাহরাইন, জর্ডান এমনকি তুরস্কও এই ধরনের বহুপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে অংশ নিতে আগ্রহী। জর্ডান ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের কাছ থেকে অস্ত্র কেনা এবং প্রশিক্ষণ নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। তারা মনে করছে, পাকিস্তান যেহেতু একটি সুন্নি প্রধান মুসলিম দেশ এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাদের সামরিক বাহিনীর সাথে মধ্যপ্রাচ্যের সম্পর্ক ভালো, তাই তাদের ওপর বাজি ধরা নিরাপদ। এছাড়া পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও একদম খারাপ নয়, ফলে এই চুক্তিটি করলে পশ্চিমা বিশ্বও খুব বেশি নাখোশ হবে না।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা কুয়েতকে প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র দিতে প্রস্তুত, কিন্তু এখনই কোনো যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “কুয়েতের চাহিদার তালিকায় সবকিছুই আছে, কিন্তু আমাদের সামর্থ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার কথা মাথায় রেখে এগোতে হবে।” ইরানকে চটিয়ে কুয়েত বা সৌদির সাথে খুব বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়া পাকিস্তানের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। কারণ ইরানের সাথে পাকিস্তানের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসলামাবাদের জন্য অনেক বেশি জরুরি।

বিশ্লেষকরাও এই বিষয়ে সতর্কবাণী উচ্চারণ করছেন। সিডনির ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক মুহাম্মদ ফয়সাল মনে করেন, পাকিস্তানের উচিত হবে না হঠাত করে কোনো বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া। তিনি বলেন, “পাকিস্তান যদি নিজেদের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে নিরাপত্তার কথা দেয়, তবে সেটি ভবিষ্যতে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।” আপাতত পাকিস্তান সরকার ও সামরিক বাহিনী তেলের বিনিময়ে এই ‘নিরাপত্তা কূটনীতি’ কতদূর নিয়ে যেতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। যদি চুক্তিটি সফল হয়, তবে এটি পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য এক পশলা বৃষ্টির মতো হবে, আর যদি ব্যর্থ হয় তবে আঞ্চলিক রাজনীতিতে তারা আরও একা হয়ে পড়তে পারে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ