মো: সাখাওয়াত হোসেন মামুন
পূর্বধলা, নেত্রকোনা প্রতিনিধি:
নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার রাজনীতির আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন ফকির হারুন আল হেলাল। তিনি কেবল একজন নেতাই ছিলেন না, ছিলেন সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক। বিশেষ করে শ্যামগঞ্জের ছাত্র রাজনীতিতে তাকে একজন কিংবদন্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। শুক্রবার (১৭ জুলাই, ২০২৬) এই বর্ষীয়ান নেতার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালিত হয়েছে। দিনভর নানা কর্মসূচি, দোয়া মাহফিল ও স্মরণসভার মধ্য দিয়ে প্রিয় নেতাকে স্মরণ করেছেন নেত্রকোনা জেলা ও পূর্বধলা উপজেলা বিএনপির কয়েক হাজার নেতাকর্মী। প্রিয় নেতার অভাব আজও কতটা অনুভূত হয়, তা উপস্থিত নেতাকর্মীদের আবেগঘন উপস্থিতি আর চোখের জলেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।
দিনের কর্মসূচির শুরু হয় শুক্রবার সকাল ১০:০০ ঘটিকায়। উপজেলা বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং মরহুমের পরিবারের সদস্যরা তার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর সেখানে অত্যন্ত আবেগঘন পরিবেশে কবর জিয়ারত ও ফাতেহা পাঠ করা হয়। এ সময় এক মিনিট নীরবতা পালন করে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। নেত্রকোনার মাটি ও মানুষের নেতা হিসেবে হেলাল ভাই যে ১০০% নিষ্ঠার সাথে দলের জন্য কাজ করেছেন, সে কথা জিয়ারত পরবর্তী সংক্ষিপ্ত আলোচনায় উঠে আসে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ভিড় করতে থাকেন দলীয় কার্যালয়ের সামনে।
বিকেল ৩:০০ ঘটিকার সময় পূর্বধলা উপজেলা সদরের হেলিপ্যাড মাঠ সংলগ্ন দলীয় কার্যালয়ে এক বিশাল স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন নেত্রকোণা জেলা বিএনপির সাবেক তিনবারের সফল সাধারণ সম্পাদক, নেত্রকোণা সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি এবং পূর্বধলা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ্ব আবু তাহের তালুকদার। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো: হাবিবুর রহমান ফকির। সভায় প্রধান বক্তা ও বিশেষ অতিথিরা ফকির হারুন আল হেলালের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তারা বলেন, হেলাল ভাই ছিলেন রাজপথের একজন সাহসী সৈনিক, যার হুংকারে একসময় প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শিবির তটস্থ থাকতো।
স্মরণসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে জেলা ও উপজেলার নেতারা বলেন, ফকির হারুন আল হেলাল ছিলেন শ্যামগঞ্জের ছাত্র রাজনীতির প্রাণপুরুষ। তার হাত ধরেই অনেক তরুণ নেতা রাজনীতির অলিগলি চিনেছেন। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন নেত্রকোণা জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি আব্দুর রহিম তালুকদার, পূর্বধলা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বাবুল আলম তালুকদার এবং যুগ্ম আহ্বায়ক সায়েদ আল মামুন শহীদ ফকির। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন সেলিম উদ্দিন, আনোয়ারুল ইসলাম আনার ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ বাবু। তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে হেলাল ভাইয়ের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং চরম দুঃসময়েও দলের পতাকা আঁকড়ে ধরে রাখার সেই অদম্য মানসিকতার কথা।
এদিনের সভায় অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও বিশিষ্ট কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (রতন)। তিনি মরহুমের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, হেলাল ভাই রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের সেবা করতে জানতেন। তার মতো পরোপকারী এবং বিচক্ষণ নেতার অভাব আজ পূর্বধলা তথা পুরো নেত্রকোনার বিএনপি পরিবার গভীরভাবে অনুভব করছে। সভায় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক এম এ মনসুর খোকন আকন্দ এবং ছাত্রদলের আহ্বায়ক সালমান রহমান পল্লবসহ কয়েকশ তরুণ কর্মী, যারা হেলাল ভাইকে তাদের আদর্শ হিসেবে মানেন।
ফকির হারুন আল হেলালের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তিনি নেত্রকোণা জেলা বিএনপির সাবেক কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ও সম্মানিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর পাশাপাশি নেত্রকোণা জেলা কৃষক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও তার অবদান অনস্বীকার্য। পূর্বধলা উপজেলা কৃষক দলের সাবেক আহ্বায়ক এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিকে সুসংগঠিত করেছিলেন। বক্তারা বলেন, আজ যখন বিএনপি একটি কঠিন সময় পার করছে, তখন হেলাল ভাইয়ের মতো সংগঠকের খুব প্রয়োজন ছিল। দল ও সংগঠনের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল ১০০% নিখাদ।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে এক বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়। দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন উপজেলা ওলামা দলের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মজিবর রহমান মন্ডল। এ সময় মোনাজাতে উপস্থিত শত শত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ দুহাত তুলে পরম করুণাময়ের কাছে প্রিয় নেতার জান্নাত কামনা করেন। দোয়া শেষে উপস্থিত সবার মাঝে তবারক বিতরণ করা হয়। নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, হেলাল ভাইয়ের আদর্শকে ধারণ করেই তারা আগামী দিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে থাকবেন।
পূর্বধলার প্রতিটি অলিতে গলিতে আজ ফকির হারুন আল হেলালের নাম উচ্চারিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরছে তার করা নানা জনহিতকর কাজের গল্প। যদিও তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া রাজনৈতিক শিক্ষা ও আদর্শ এখনো পূর্বধলা বিএনপির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। এই স্মরণসভার মধ্য দিয়ে এটি আবারো প্রমাণিত হলো যে, ত্যাগী ও সৎ নেতাদের মৃত্যু হলেও তারা মানুষের হৃদয়ে আজীবন বেঁচে থাকেন। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত এই কিংবদন্তি নেতা আজীবন পূর্বধলাবাসীর স্মৃতিতে অমর হয়ে থাকবেন।
















