চট্টগ্রামের এইচএসসি পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত: বন্যার কবলে বিপর্যস্ত হাজারো পরীক্ষার্থী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চট্টগ্রাম অঞ্চলে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি ও টানা বর্ষণের কারণে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড থেকে আসা এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। মূলত বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং পরীক্ষার্থীদের যাতায়াতের চরম দুর্ভোগের কথা চিন্তা করেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম বোর্ডের অধীনে আর কোনো পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার রাস্তাঘাট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তত ৭০% থেকে ৮০% গ্রামীণ সড়ক এখন পানির নিচে অথবা চলাচলের অনুপযোগী। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের পক্ষে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানো জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার সমান। এছাড়া বহু পরীক্ষার্থীর ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ার কারণে তাদের বইপত্র ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের এই শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া যুক্তিসঙ্গত মনে করেনি বোর্ড কর্তৃপক্ষ। তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে।

এই স্থগিতাদেশ কেবল সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের জন্য নয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধীনে থাকা মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষাও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ আলিম, এইচএসসি (বিএম/বিএমটি), ভোকেশনাল এবং ডিপ্লোমা ইন কমার্স—সব ধরণের পরীক্ষাই এখন স্থগিত। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, দেশের অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডগুলোতে নির্ধারিত রুটিন অনুযায়ী পরীক্ষা যথারীতি চলবে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, “রাস্তাঘাটের যে অবস্থা, তাতে অনেক পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারছে না। আমরা চাই না কোনো শিক্ষার্থী কেবল দুর্যোগের কারণে পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হোক। তাই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারের বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগের শিক্ষা খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক। প্রাথমিক হিসেবে দেখা গেছে, অন্তত ১৫% পরীক্ষাকেন্দ্র সরাসরি বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। অনেক স্থানে পানি হাঁটু থেকে কোমর সমান পর্যন্ত উঠেছে। খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের মাইসছড়ি এলাকায় যানবাহন চলাচল ১০০% বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষকে নৌকায় যাতায়াত করতে হচ্ছে। এছাড়া বন্যার কারণে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বর্তমানে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে কয়েক হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন, ফলে পরীক্ষা নেওয়ার মতো পরিবেশ সেখানে আপাতত নেই।

এর আগে আবহাওয়া অফিসের সতর্কতা এবং প্রাথমিক বন্যা পরিস্থিতির কারণে ১৬ জুলাই পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল। তখন সবাই আশা করেছিল পরিস্থিতি হয়তো দ্রুত স্বাভাবিক হবে। কিন্তু গত ৪৮ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আরও বেড়ে যাওয়ায় এবং পাহাড়ি ঢলের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য পরীক্ষা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অনেক পরীক্ষার্থীর পরিবার এখন খাদ্য সংকটে রয়েছে। যেখানে জীবন বাঁচানোই বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বোর্ডের এই সিদ্ধান্তে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও দুশ্চিন্তা রয়ে গেছে নতুন সময়সূচি নিয়ে।

শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর এবং রাস্তাঘাট মেরামতের কাজ অন্তত ৫০% সম্পন্ন হলে নতুন পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হবে। স্থগিত হওয়া পরীক্ষাগুলোর সংশোধিত সময়সূচি যথাসময়ে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এবং বোর্ডের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে জানিয়ে দেওয়া হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের বিশেষ সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

বন্যার কারণে কেবল যাতায়াত নয়, ইন্টারনেট এবং বিদ্যুৎ সংযোগও অনেক এলাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী অনলাইনের মাধ্যমেও শিক্ষা বোর্ডের জরুরি তথ্যগুলো জানতে পারছে না। এই সংকটময় সময়ে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এবারের বন্যার তীব্রতা গত ২০ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অনেক জায়গায় যাতায়াত খরচ সাধারণ সময়ের তুলনায় ২০০% থেকে ৩০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ পরিবারের শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।

সবশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা এক কঠিন সময়ের মুখোমুখি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই প্রভাব তাদের শিক্ষাজীবনে কতটুকু প্রভাব ফেলবে তা এখনই বলা মুশকিল। তবে শিক্ষা বোর্ডের এই সিদ্ধান্তের ফলে অন্তত এই মুহূর্তে প্রাণহানির ঝুঁকি বা চরম দুর্ভোগ থেকে তারা রেহাই পেয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সাথে সাথেই শিক্ষা কার্যক্রম আবার শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য ধরার এবং গুজবে কান না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ