বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই নদীমাতৃক বাংলাদেশের নিচু এলাকাগুলোতে নৌকার কদর বেড়ে যায়। শরীয়তপুর জেলার সদর উপজেলার বুড়িরহাট এলাকায় ঠিক এমনই এক শতবর্ষী নৌকার হাটের দেখা মেলে। মূলত স্থানীয় কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাবেচার জন্য এই হাটের যাত্রা শুরু হলেও, সময়ের বিবর্তনে এটি এখন অঞ্চলের সবচেয়ে বড় নৌকার হাটে পরিণত হয়েছে। প্রায় ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বুড়িরহাটে নৌকা কেনাবেচা হচ্ছে। বর্ষার পাঁচ মাস এই হাটে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে এই কেনাবেচার ধুম। ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত থাকে পুরো এলাকা।
শরীয়তপুর সদর উপজেলার শেষ প্রান্তে ভেদরগঞ্জ ও ডামুড্যা উপজেলার সীমানাসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত এই বুড়িরহাট। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, বিশ শতকের শুরুর দিকে যখন এখানে বাজার বসে, তখন কেবল শাকসবজি আর ধান-চাল বিক্রি হতো। এরপর বর্ষা মৌসুমে এলাকার কাঠমিস্ত্রিরা নিজেদের তৈরি নৌকা এখানে নিয়ে আসতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে এটি নৌকার হাট হিসেবে পরিচিতি পায়। শরীয়তপুর-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে হওয়ায় যাতায়াতের সুবিধাও অনেক। বর্তমানে এই হাটের আশপাশে ২০০টির বেশি স্থায়ী দোকানপাট গড়ে উঠেছে। এছাড়া এখানে স্কুল, কলেজ, মসজিদ ও মন্দিরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনা রয়েছে। ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠেই মূলত এই নৌকার হাট বসে। মজার ব্যাপার হলো, স্কুল কর্তৃপক্ষ গত ৭ দশকেরও বেশি সময় ধরে এই হাট থেকে কোনো খাজনা আদায় করে না।
প্রতি মঙ্গলবার ভোর ৫টা বাজার আগেই মাঠ ভরে যায় সারিবদ্ধ নৌকায়। বেলা ২টা পর্যন্ত চলে বিকিকিনি। মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি হাটে গড়ে ৪০ থেকে ৫০টি নৌকা বিক্রি হয়। অর্থাৎ এক মৌসুমে এখানে প্রায় ৮০০ থেকে ১,০০০টি নৌকা বিক্রি হয়। দামের দিক থেকে এই হাট বেশ সস্তা। একটি নতুন নৌকার দাম পড়ে ৮,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা পর্যন্ত। বর্তমান বাজার দরে যা প্রায় $৭৫ থেকে $১৪০ ডলারের সমান। আবার যাদের বাজেট কম, তাদের জন্য আছে পুরোনো নৌকার ব্যবস্থা। মাত্র ৩,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকায় এখানে ব্যবহৃত বা পুরোনো নৌকা পাওয়া যায়। দামাদামি করে নিজের পছন্দমতো নৌকা কিনে বাড়ি ফেরেন দূর-দূরান্তের মানুষ।
এই হাটের নৌকাগুলো মূলত তৈরি হয় সদর উপজেলার পাটানিগাঁও, চন্দনকর, রুদ্রকর এবং ভেদরগঞ্জ ও ডামুড্যা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। স্থানীয় কাঠমিস্ত্রিরা সারাবছর অন্যান্য কাজ করলেও বর্ষার আগে তারা নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। একজন মিস্ত্রি সপ্তাহে সাধারণত দুটি ছোট নৌকা তৈরি করতে পারেন। কাঠ কেনা থেকে শুরু করে মিস্ত্রি খরচ বাদ দিলে একটি নৌকা বিক্রি করে তাদের ২,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকা লাভ থাকে। মিস্ত্রিরা মূলত এলাকার ‘গোয়ারা’ ও ‘উড়িয়া’ জাতের আমগাছের কাঠ ব্যবহার করেন। এই কাঠ পানিতে টেকসই হয় এবং দামেও সাশ্রয়ী। তবে বর্তমানে কাঠের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং লাভের পরিমাণ কমে যাওয়ায় প্রায় ২০% মিস্ত্রি তাদের আদি পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যোগ দিয়েছেন।
পাটানিগাঁও গ্রামের অনিল মণ্ডল এই হাটের একজন নিয়মিত বিক্রেতা। ৭০ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ গত ৫৫ বছর ধরে এই হাটে নৌকা বিক্রি করছেন। বাবার হাত ধরে ১৫ বছর বয়সে তিনি এই কাজে এসেছিলেন। অনিল মণ্ডল বলেন, “আমাদের বাপ-দাদারা এই হাটে নৌকা বিক্রি করেই সংসার চালাতেন। আমিও সেই পথেই চলছি। এপ্রিল মাস থেকে নৌকা বানানো শুরু করি আর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিক্রি চলে।” তার মতো অনেক প্রবীণ মিস্ত্রি এখনো এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছেন। তাদের হাতের তৈরি নৌকা শরীয়তপুর ছাড়িয়ে আশপাশের জেলাগুলোতেও যায়।
ক্রেতাদের কাছেও এই হাটের গুরুত্ব অপরিসীম। ডামুড্যা থেকে আসা ৮০ বছর বয়সী কৃষক আয়ুব আলী জানান, তাদের এলাকার চারদিকে নদী। বর্ষার সময় চারদিকে পানি থৈ থৈ করে। তখন বাড়ির বাইরে যেতে হলে নৌকা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। বিশেষ করে চাষাবাদের সরঞ্জাম এক মাঠ থেকে অন্য মাঠে নিতে নৌকাই একমাত্র ভরসা। তিনি বলেন, “ছোটবেলায় বাবার সাথে নৌকা কিনতে আসতাম, এখন নাতিকে নিয়ে আসি। একটি নতুন নৌকা ঠিকমতো যত্ন করলে ৫-৬ বছর অনায়াসেই চলে যায়।” আয়ুব আলীর মতো শত শত মানুষ এই হাটে আসেন দীর্ঘস্থায়ী ও মজবুত নৌকার খোঁজে।
নৌকার এই হাটটি কেবল একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, এটি শরীয়তপুরের সংস্কৃতির একটি অংশ। প্রতি মঙ্গলবার এখানে যে প্রাণের স্পন্দন দেখা যায়, তা সত্যিই বিরল। স্থানীয় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট বা কলেজের শিক্ষার্থীরাও ক্লাস শেষে ভিড় করেন এই হাটের আমেজ দেখতে। আধুনিকায়নের ফলে অনেক জায়গায় এখন যান্ত্রিক ট্রলার বা ইঞ্জিনচালিত নৌকা দেখা গেলেও, সাধারণ কৃষকের কাছে এখনো ছোট কাঠের ডিঙি নৌকার আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। শরীয়তপুরের নিচু অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার সাথে মিশে আছে এই বুড়িরহাটের ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট।
















