বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নতুন অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন রিয়ার অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম। দেশের সমুদ্রসীমা রক্ষা এবং নীল অর্থনীতির (Blue Economy) সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকার তার ওপর এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। আগামী ২৩ জুলাই তিনি ভাইস অ্যাডমিরাল পদে পদোন্নতি পাবেন এবং একই দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবাহিনী প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। এই নিয়োগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই নৌবাহিনীর ভেতরে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। সবাই মনে করছেন, তার মতো একজন মেধাবী ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা নৌবাহিনীকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করে তুলবেন।
বর্তমান নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান আগামী ২৩ জুলাই পর্যন্ত তার দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি ২০২৩ সালের ২৪ জুলাই থেকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নৌবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তার বিদায়ের পর নতুন প্রধান হিসেবে মিসবাহ উল আজীম দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। একজন দক্ষ ও চৌকস কর্মকর্তা হিসেবে মিসবাহ উল আজীমের খ্যাতি দীর্ঘদিনের। ১৯৮৭ সালের ১ জানুয়ারি তিনি যখন বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন, তখনই তিনি নিজের মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন। তার ব্যাচ ‘৮৭এ’ (87A)-এর জ্যেষ্ঠতা ও মেধা—উভয় তালিকাতেই তিনি ১ নম্বর স্থান অর্জন করেছিলেন। অর্থাৎ শুরু থেকেই তার সাফল্যের হার ছিল ১০০%। এই অসাধারণ কৃতিত্বই তাকে আজ নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে এসেছে।
মিসবাহ উল আজীমের শিক্ষাজীবন ছিল চোখে পড়ার মতো উজ্জ্বল। তিনি কেবল রণকৌশলে নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাতেও নিজেকে সেরা হিসেবে প্রমাণ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে মেরিটাইম গভর্ন্যান্সের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এছাড়া তিনি ভারতের মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং চীনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চতর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনি মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন এবং তার এই অসামান্য সাফল্যের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ‘চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছিলেন। নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তার এত গভীর ও বহুমুখী শিক্ষাগত যোগ্যতা সত্যিই বিরল। বর্তমান যুগের আধুনিক নৌবাহিনী গড়তে তার এই তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান ১০০ ভাগ কাজে লাগবে বলে সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও মিসবাহ উল আজীম বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। বর্তমানে তিনি ওমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। বিদেশের মাটিতে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে তিনি সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। এছাড়া জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনেও তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি লেবানন এবং কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের মতো চ্যালেঞ্জিং দেশে শান্তি মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক এই অভিজ্ঞতা তাকে বিশ্বরাজনীতি এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা বুঝতে বিশেষভাবে সাহায্য করবে। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং জলদস্যুতা দমনে তার এই আন্তর্জাতিক জ্ঞান একটি প্লাস পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে।
নৌবাহিনীর নতুন প্রধান হিসেবে তার সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা থেকে সম্পদ আহরণ এবং তা রক্ষা করার জন্য একটি আধুনিক ও ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনী গঠন করা সময়ের দাবি। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার নীল অর্থনীতির ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে, যা থেকে প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলার ($) আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সমুদ্র সম্পদ রক্ষা করতে হলে নৌবাহিনীর সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। মিসবাহ উল আজীম তার দীর্ঘ কর্মজীবনে বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজ ও ঘাঁটির অধিনায়ক হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার নেতৃত্বে নৌবাহিনীতে নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক রণকৌশলের সমন্বয় ঘটবে বলে সবাই আশাবাদী। তার লক্ষ্য হবে নৌবাহিনীর প্রতিটি সদস্যের মনোবল ১০০% বজায় রাখা এবং বাহিনীর আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা।
সামরিক বাহিনীর একজন নেতার জন্য কেবল মেধা থাকলেই চলে না, প্রয়োজন হয় সঠিক নেতৃত্ব ও মানবিক গুণাবলি। রিয়ার অ্যাডমিরাল মিসবাহ উল আজীম তার সহকর্মীদের কাছে একজন সহজ-সরল কিন্তু নীতিবান মানুষ হিসেবে পরিচিত। তার অধীনে কাজ করা জুনিয়র কর্মকর্তারা মনে করেন, তিনি সবসময় নতুনদের উৎসাহ দেন এবং নতুন আইডিয়া গ্রহণ করতে দ্বিধা করেন না। নৌবাহিনীর ভেতরের প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কার এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তার ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে তার স্বচ্ছতা ও দূরদর্শিতা বাহিনীর মর্যাদা আরও বাড়িয়ে দেবে।
২৩ জুলাই যখন তিনি ভাইস অ্যাডমিরাল হিসেবে নৌবাহিনীর ব্যাটন হাতে নেবেন, তখন দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তার এক নতুন অধ্যায় শুরু হবে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি পাহারা দেওয়া এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে তার মূল কাজ। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নৌবাহিনীর উদ্ধার তৎপরতা এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকেও তিনি আরও গতিশীল করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার এই নিয়োগ কেবল নৌবাহিনীর জন্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যই একটি ইতিবাচক দিক। একজন প্রকৃত পেশাদার সৈনিকের হাতেই এখন অর্পিত হতে যাচ্ছে সমুদ্রে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার চাবিকাঠি।
পরিশেষে বলা যায়, রিয়ার অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম তার জীবনের প্রতিটি ধাপে যেভাবে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন, নৌবাহিনী প্রধান হিসেবেও তিনি সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ নৌবাহিনী বিশ্বের বুকে একটি শক্তিশালী ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। সমুদ্রের নীল জলরাশিতে উড়বে বিজয়ের নিশান এবং নিশ্চিত হবে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। ২৩ জুলাই সারা দেশের মানুষ এবং নৌবাহিনীর সদস্যরা গভীর আগ্রহ নিয়ে তার দায়িত্ব গ্রহণের মুহূর্তটির অপেক্ষা করছেন। নৌবাহিনীর নতুন দিগন্তের এই সূচনালগ্নে তার জন্য রইল শুভকামনা।
















