শ্রীনগরে ইসলামী ব্যাংকের ‘গ্রাহক সেবা মাস’ শুরু: হারানো আস্থায় ফিরছেন হাজারো গ্রাহক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

শ্রীনগর (মুন্সীগঞ্জ) সংবাদদাতা:

‘কল্যাণমুখী ব্যাংকিংয়ের অগ্রযাত্রায় গড়ি আগামীর বাংলাদেশ’ এই জোরালো স্লোগানকে সামনে রেখে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’র ‘গ্রাহক সেবা মাস’ শুরু হয়েছে। বুধবার (১৫ জুলাই) শ্রীনগর শাখায় এই বিশেষ সেবা মাস উপলক্ষে এক আলোচনা সভা ও গ্রাহক মতবিনিময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শ্রীনগর উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ব্যাংকের শাখাটি এদিন গ্রাহকদের উপস্থিতিতে মুখরিত ছিল। গত কয়েক মাসে ব্যাংকিং খাতে নানা গুঞ্জন ও অস্থিরতা থাকলেও, আজকের এই অনুষ্ঠানে গ্রাহকদের উপস্থিতি ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে যে, সাধারণ মানুষ আবারও এই প্রতিষ্ঠানের ওপর ১০০% আস্থা ফিরে পেতে শুরু করেছে। বেলা ১১টায় শুরু হওয়া এই সভাটি দুপুর গড়িয়ে বিকেল পর্যন্ত চলে, যেখানে গ্রাহক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রাণবন্ত আলোচনা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইসলামী ব্যাংক শ্রীনগর শাখার প্রধান এবং সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসএভিপি) মো. ইসমাইল হোসেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল ডা. মো. মোজাহেরুল হক। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “ব্যাংক হলো একটি আস্থার জায়গা। মানুষ তার কষ্টের উপার্জিত টাকা ব্যাংকে রাখে নিরাপত্তার জন্য। ইসলামী ব্যাংক গত ৪ দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে অবদান রেখেছে, তা ভোলার মতো নয়। কিছু সময়ের জন্য মানুষের মনে দ্বিধা তৈরি হলেও, আজ শ্রীনগর শাখার এই ভিড় বলে দিচ্ছে যে মানুষের ভরসা আবারও ফিরে এসেছে।” তিনি আরও বলেন, একটি দেশ গড়তে হলে মজবুত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই এবং ইসলামী ব্যাংক সেই দায়িত্ব পালনে শতভাগ সফল।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর খান ও মো. আব্দুর রহিম সরকার ব্যাংকের বর্তমান সেবার মান নিয়ে আলোচনা করেন। তারা বলেন, বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের শ্রীনগরসহ সারা দেশের সব শাখা, উপশাখা ও এজেন্ট আউটলেটগুলোতে লেনদেন আগের মতোই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে এখন ২৪/৭ সব ধরনের লেনদেন করা সম্ভব হচ্ছে। ব্যাংকের কর্মকর্তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আন্তরিকতার সাথে সেবা দিচ্ছেন। কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে ইসলামী ব্যাংকের অবদান সবচেয়ে বেশি। প্রবাসী ভাই-বোনেরা প্রতি মাসে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ($) দেশে পাঠাচ্ছেন এই ব্যাংকের মাধ্যমে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

গ্রাহকদের পক্ষে অনুষ্ঠানে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন তাজমা আক্তার, নুরজামান মীর ও আব্দুল হাই। তারা বলেন, “মাঝখানে কিছু গুজবের কারণে আমরা একটু দুশ্চিন্তায় ছিলাম, এমনকি অনেকে তাদের জমানো টাকা তুলেও নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন দেখছি ব্যাংক অনেক বেশি স্বচ্ছভাবে কাজ করছে। আমাদের পরিচিত যারা টাকা তুলে নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ৯০% মানুষই আবারও নতুন করে অ্যাকাউন্ট খুলছেন এবং টাকা জমা রাখছেন।” নুরজামান মীর নামের একজন ব্যবসায়ী গ্রাহক বলেন, “শ্রীনগরের ব্যবসা-বাণিজ্যে ইসলামী ব্যাংক সবসময় আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকটি যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে আমাদের স্থানীয় অর্থনীতির ওপর বড় আঘাত আসবে। তাই আমরা সবাই মিলে এই ব্যাংককে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।” গ্রাহকদের এমন ইতিবাচক বক্তব্যে উপস্থিত ব্যাংক কর্মকর্তারাও উৎসাহিত হন।

অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে মো. গোলাম সারওয়ার বলেন, গ্রাহক সেবা মাস পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রাহকদের অভাব-অভিযোগ সরাসরি শোনা এবং সেগুলোর দ্রুত সমাধান করা। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইসলামী ব্যাংক এখন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। প্রতিটি লেনদেনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর সরকার প্রদত্ত ২.৫% প্রণোদনার পাশাপাশি ব্যাংক আরও অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার ($) আহরণ অনেক বেড়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি স্বস্তির খবর। শ্রীনগর শাখার কর্মকর্তারা জানান, তারা প্রতিদিন শত শত গ্রাহককে বিরামহীন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করেন ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার মো. মারুফ হোসাইন। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন থেকে তিলাওয়াত করেন হাফেজ মো. আল আমিন। ব্যাংকিং সেবার পাশাপাশি নৈতিকতা ও সততার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন উপস্থিত ওলামায়ে কেরাম। বক্তারা বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা কেবল মুনাফা অর্জনের জন্য নয়, বরং এটি একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার মাধ্যম। শ্রীনগর শাখার সেবার মান বর্তমানে আগের তুলনায় ৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে বলে কর্মকর্তারা দাবি করেন। তারা আশ্বস্ত করেন যে, কোনো গ্রাহকই এখন ব্যাংক থেকে ফিরে যাচ্ছেন না; বরং প্রতিদিন নতুন নতুন ডিপিএস এবং ফিক্সড ডিপোজিট খোলার হার বাড়ছে।

সভা শেষে এক বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করা হয়। মুফতি মো. ইসহাক দোয়া পরিচালনা করেন। মোনাজাতে দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি, শান্তি এবং ইসলামী ব্যাংকের উত্তরোত্তর উন্নতি কামনা করা হয়। এছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন, তাদের জন্যও বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। দোয়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবার চোখে-মুখে এক ধরনের প্রশান্তি দেখা গেছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, দেশের এই পরিবর্তনের সময়ে ইসলামী ব্যাংক যদি শক্তভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তবে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও চাঙ্গা হবে। শ্রীনগর উপজেলার অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষকরাও এই ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ সুবিধা নিয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন।

পরিশেষে, শ্রীনগর শাখা প্রধান মো. ইসমাইল হোসেন উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন। তিনি আবারও প্রতিশ্রুতি দেন যে, শ্রীনগর শাখা গ্রাহকদের সেবায় সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। গ্রাহক সেবা মাসের এই বিশেষ কার্যক্রম পুরো মাসব্যাপী চলবে এবং প্রতিটি গ্রাহককে ব্যাংকে আসার সাথে সাথে সর্বোচ্চ সম্মান ও সেবা প্রদান করা হবে। অনুষ্ঠান শেষে আগত গ্রাহকদের মিষ্টি ও হালকা নাস্তা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। এই সভাটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং এটি ছিল ব্যাংক এবং গ্রাহকদের মধ্যে একটি নতুন আস্থার সেতু বন্ধন। শ্রীনগরবাসী আশা করছেন, এই ব্যাংকটি আগামীতে আরও উন্নত প্রযুক্তি ও স্বচ্ছতা নিয়ে তাদের সেবা দিয়ে যাবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ